গত পরশু শনিবার (২৫ এপ্রিল) টুঙ্গিপাড়া-গোপালগঞ্জের ছেলে, কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী’র মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তরুণ এই কর্মকর্তা চট্টগ্রাম হতে ট্রেনিং শেষে কুমিল্লার ভাড়াবাসায় ফেরার পথে কোথাও খুনের শিকার হয়েছেন। প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, কুমিল্লার কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেষ কথাও বলেছিলেন তিনি। এরপরই হঠাৎ তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সকালে মহাসড়কের পাশে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে আরও জানা যায়, ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মমিন বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল পেয়ে সকাল পৌনে ৮টার দিকে কোটবাড়ী এলাকার মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনের পাশ থেকে বুলেট বৈরাগীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বুলেট বৈরাগীর ভাড়াবাসা কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার অধীনে এবং নিকটস্থ বলে বুলেট বৈরাগীর আত্মীয়-স্বজন প্রথমে নিকটস্থ কোতোয়ালি থানাতেই যায়।
এরপর ঘটনার বিবরণে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকালে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করতে আসে। তখন আমরা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে দেখি, তাঁর মুঠোফোন সর্বশেষ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার একটি এলাকা পর্যন্ত চালু ছিল। পরে তাদের সদর দক্ষিণ থানায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।’
ঘটনার এই পর্যন্ত আমরা তিনটি থানার নাম পেলাম। প্রথমে কুমিল্লার ময়নামতি হাইওয়ে থানায় মরদেহ উদ্ধার, কোতোয়ালি থানায় শুরুতেই নিখোঁজ ডায়েরি করতে যাওয়া এবং সদর-দক্ষিণ থানায় সর্বশেষ মুঠোফোনের ব্যবহার। স্বভাবতই, সকালবেলা নিকটস্থ কোতোয়ালি থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করতে গিয়েছিলেন বুলেট বৈরাগীর বাবা, নয়ত মা, নয়ত স্ত্রী। যাদের কেউই থানার সাথে সম্পৃক্ত থাকার কথা নয়। এমনও হতে পারে তারা জীবনের প্রথম থানার দ্বারস্থ হয়েছিলেন।
কিন্তু জনগণের বন্ধু পুলিশ বুলেট বৈরাগীর সর্বশেষ মুঠোফোনের ব্যবহার স্থান শনাক্ত করতে পারলেও সাধারণ ডায়েরির এন্ট্রি নেননি। কোতোয়ালি থানা খুব সুন্দর করে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সটকে পড়েছে। এক্ষেত্রে কোতোয়ালি থানা দ্রুত সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করে সমন্বয় করতে পারতেন।
এমন অহরহ দেখা যায় যেখানে থানাগুলো সাধারণত আমলযোগ্য মামলাগুলো প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করতে চায় না। অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে শান্তিতে ঝিমানোর পায়তারা খুঁজেন তারা। আমল অযোগ্য মামলা হলে তো কোর্ট কোন দিক দেখিয়ে দিয়ে একটি কথাও আর বলতে চাইবেন না। অথচ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমলযোগ্য মামলার তথ্য পেলে তা এফআইআর হিসেবে লিখে নিয়ে তদন্ত শুরু করতে বাধ্য থাকেন। আইনের কোথাও বলা হয়নি এক থানার মামলা অন্য থানা গ্রহণ করলে অশুচি হয়ে যাবেন। আইনে বরং বলা আছে,
কোন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট কোন আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটন সম্পর্কে মৌখিকভাবে দেওয়া প্রত্যেকটি সংবাদ তিনি লিখিয়া লইবেন অথবা তাহার নির্দেশক্রমে উহা লিখিত হইবে, এবং সংবাদদাতাকে উহা পড়িয়া শুনাইতে হইবে, এবং লিখিতভাবে প্রদত্ত বা উপযুক্ত মতে লিখিত এইরূপ প্রত্যেকটি সংবাদ ইহা প্রদানকারী ব্যক্তি কর্তৃক স্বাক্ষরিত হইবে, এবং উহার সারমর্ম উক্ত অফিসার কর্তৃক এই এতদুদ্দেশ্যে সরকারের নির্ধারিত আকারে রক্ষিত একটি বহিতে লিপিবদ্ধ করিতে হইবে।
এখানে থানার আন্ডারে পড়েছে কি পড়েনি তা কোথাও বলা হয়নি। বরং জিরো এফআইআর নামে একটি শব্দ আছে যেখানে যেকোন থানা আমলযোগ্য তথ্য এফআইআর হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন কিন্তু কোন নাম্বার এন্ট্রি করেন না। এই কারণেই এটির নাম জিরো-এফআইআর। তৎপরবর্তীতে নির্দিষ্ট থানাকে এফআইআরটি ফরোয়ার্ড করা হয়।
এছাড়াও বাংলাদেশের পুলিশ একটি প্রতিষ্ঠান। মানুষ পুলিশের কাছে যাবে কোন রঙ দেখে, উচ্চতা দেখে, কোন থানায় কাজ করেন সেই পরিচয়পত্র দেখে নয়। পুলিশ মানে পুলিশই, সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত-ট্রেনিংপ্রাপ্ত পুলিশ। সদর থানা, হাইওয়ে থানা, লালমোহন থানা দিয়ে বিচার করা জনগণের কাজ নয়। গ্লোবাল ভিলেজের এই যুগে ইন্টারপোল আন্তর্জাতিকভাবেও কাজ করে। চৌদ্দ হাজার মাইল দূরের অপরাধীকেও গ্রেফতারের পন্থা থাকে। কিন্তু একজন সদ্য সন্তান হারানো বাবা কিংবা সদ্য স্বামী হারানো স্ত্রীর এই থানা, ঐ থানা দৌড়ানোর কোন নিস্তার হলো না এই দেশে।
আর আদালতের ভাষায় এফআইআর কোন এনসাইক্লোপিডিয়া নয়। এটি প্রত্যেকটি মামলার শুরু কিংবা শেষও নয়। বরং এটি কোন আমলযোগ্য অপরাধের তদন্তের সূচনা করার মাধ্যম। এমনকি কোন স্থানীয় পুলিশকে ক্রিপ্টেড ডাটা দিলেও সেখানে যদি কোন আমলযোগ্য অপরাধের সামান্যতম তথ্যও পাওয়া যায় সেটিও এফআইআর। এফআইআর সামান্য একটি মেসেজ অথবা পুলিশকে ফোনে জানানো তথ্যও হতে পারে। এফআইআর মানে ফার্স্ট ইনফর্মেশন রিপোর্ট, তথা শুরুতেই যেখানে কোন অপরাধের তথ্য পাওয়া যায়। এটি নিয়ে ছলচাতুরি কোনভাবেই কাম্য নয়।
- লেখক: মোঃ রওশন জাদীদ, অ্যাডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ।

