আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘সরকারি খরচে বিরোধ শেষ/সবার আগে বাংলাদেশ’। দিবসটি উপলক্ষে দেশের বিচারব্যবস্থায় আইনগত সহায়তার গুরুত্ব আবারও নতুন করে সামনে এসেছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ন্যায়বিচার পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার কিন্তু বাস্তবতায় অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই ২০০০ সালে প্রণয়ন করা হয় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন।
সময় ও প্রয়োজনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিচারপ্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৫ সালের ১ জুলাই একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই আইনটি ব্যাপকভাবে সংশোধন ও আধুনিকায়ন করা হয়। এই পরিবর্তনকে বিচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে আইনগত সহায়তা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আনা হয়েছে। আগে এটি একটি সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হলেও এখন এটিকে পূর্ণাঙ্গ ‘অধিদপ্তর’ হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি একজন মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, যিনি এই অধিদপ্তরের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এর ফলে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন আরও দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনগত সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং তাঁর কারাজীবনের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় ১৮ মাস কারাগারে অবস্থানকালে তিনি দেখেছেন, প্রায় ৩০ শতাংশ কয়েদি শুধু দারিদ্র্যের কারণে বিনা বিচারে বা বিনা কারণে কারাগারে ছিলেন। আইনগত সহায়তা ও আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে তারা নিজেদের পক্ষে লড়াই করতে না পেরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা এবং আইনমন্ত্রীর প্রতি বিশেষ নির্দেশনা রাষ্ট্রকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে আরও উদ্বুদ্ধ করেছে।
২০২৫ সালের সংশোধিত অধ্যাদেশে আইনগত সহায়তার আওতা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এখন যেসব বিষয়ে লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করা যাবে, তার মধ্যে রয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ। যেমন পারিবারিক আদালত আইন এবং পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী সৃষ্ট বিরোধ।
এছাড়া ভূমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধও এর আওতায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, বণ্টন মামলা এবং অগ্রক্রয় সংক্রান্ত বিরোধ। আর্থিক বিরোধের ক্ষেত্রেও সহায়তা পাওয়া যাবে, বিশেষ করে চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলা, যার সীমা অনধিক ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী সুরক্ষার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে নতুন কাঠামোয়। যৌতুক নিরোধ আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারা অনুযায়ী যৌতুক সংক্রান্ত নির্যাতনের অভিযোগও এখন এই সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংশোধনী বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এর মাধ্যমে প্রান্তিক ও অসচ্ছল জনগোষ্ঠীও রাষ্ট্রীয় খরচে আইনি সহায়তা ও পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা আগে সীমিত ছিল।
নতুন ব্যবস্থায় মামলার আগে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগও তৈরি হয়েছে। লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে আদালতে যাওয়ার আগেই অনেক বিরোধ মীমাংসা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে আদালতের ওপর মামলার চাপ কমবে এবং বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে। একই সঙ্গে সরকারি খরচে আইনজীবী ও পরামর্শ পাওয়ায় দরিদ্র বিচারপ্রার্থীদের আর্থিক চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ন্যায়বিচার এখন আর কেবল আদালতের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবে এগোচ্ছে। ২০২৫ সালের এই সংশোধনীকে তাই বিচার ব্যবস্থাকে আরও মানবিক, সময়োপযোগী ও জনবান্ধব করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

