ভূমি আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো— “যার দলিল, তারই জমি।” দীর্ঘদিন ধরে এ নীতিই জমির মালিকানা নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু কখনো কখনো সেই দলিলের হিসাব-নিকাশেই তৈরি হয় জটিলতা, যা আইনের স্বাভাবিক প্রবাহকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে চলমান ৫২/০৪ নম্বর বাটোয়ারা মামলায় তেমনই এক বিস্ময়কর চিত্র উঠে এসেছে। মামলার আরজি ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় এমন এক হিসাবগত কারসাজির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যেখানে পুরোনো দলিলকে আধুনিক সময়ে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সংখ্যার মারপ্যাঁচ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, কড়া-গণ্ডা-ছটাকের পুরনো হিসাবকে ভিত্তি করে এমনভাবে রূপান্তর করা হয়েছে, যা সময়ের ব্যবধানে দলিলের প্রকৃত অর্থ ও পরিমাপ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটিকে সাধারণ ভুল নয় বরং এক ধরনের সুপরিকল্পিত “গাণিতিক জালিয়াতি” হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মামলাটিকে ঘিরে এখন স্থানীয় মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিষয়টি কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
নালিশী জমির সংক্ষিপ্ত পটভূমি ও মালিকানা বিতর্ক:
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর মৌজার (জে.এল নং ৪১) সিএস খতিয়ান নং ৩০৩ এবং সাবেক দাগ নং ৫২৬-এর আওতায় মোট জমির পরিমাণ ২৪ শতক। নথিপত্র অনুযায়ী এই জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলমান রয়েছে।
বিবাদী পক্ষের (লেখক হিসেবে উল্লেখিত) দাবি অনুযায়ী, পত্তন ও দখলের ভিত্তিতে তারা ৮ শতক জমির প্রকৃত মালিক। অন্যদিকে বাদীপক্ষের দালিলিক মালিকানা সর্বোচ্চ ১৫.৫৬ শতকের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে দাবি করা হয়েছে। এই মালিকানা বিরোধকে কেন্দ্র করেই মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
জালিয়াতির ১০টি শক্তিশালী আইনী ও গাণিতিক ব্যবচ্ছেদ:
১. গাণিতিক প্রতারণা: বাদীরা আরজিতে দাবি করেছেন যে ২ কাঠা ২ ছটাক ১০ গণ্ডা জমি মানে ৯ শতক। অথচ সরকারি স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী এর পরিমাণ মাত্র ৩.৫৬ শতক। ৩.৫৬ শতককে ৯ শতক বানানো স্রেফ ভুল নয়, বরং এটি একটি দালিলিক জালিয়াতি।
২. কাল্পনিক যোগফল ও কারসাজি: বাদীরা তাদের ৩.৫৬ শতকের দলিলকে ৯ শতক লিখে তার সাথে অপর দলিলের ১২ শতক যোগ করে ৯+১২ = ২১ শতকের এক কাল্পনিক যোগফল তৈরি করেছেন। ১৫.৫৬ শতককে ২১ শতক বানানোই ছিল আমাদের ৫ শতক জমি গ্রাস করার মূল ফন্দি।
৩. এস.এ ২৯১ খতিয়ানের স্ববিরোধিতা: খতিয়ানে এই ৬ জন মালিকের মোট অংশ বা হিস্যা উল্লেখ আছে মাত্র ০.৫০ (অর্থাৎ ৮ আনা)। ১৬ আনা মালিকানার জন্য অংশ ১.০০০ হওয়া আবশ্যক। তারা খতিয়ানের অর্ধেক অংশকে জালিয়াতির মাধ্যমে পূর্ণ ২১ শতক দাবি করছে।
৪. ‘কোর্ফা’ স্বত্বের সীমাবদ্ধতা: খতিয়ানে বাদীদের নাম ‘কোর্ফা’ বা উপ-প্রজা হিসেবে নথিভুক্ত। আইন অনুযায়ী, কোর্ফা দখলদার কখনো মূল দলিলের সীমানা এবং দালিলিক পরিমাণের বাইরে এক ইঞ্চি জমিও দাবি করতে পারে না।
৫. ছয়জন মালিক বনাম ৪ ভাইয়ের কাল্পনিক বণ্টন: বাদীরা ৪ ভাইয়ের ৫.২৫ শতক করে ২১ শতকের যে ‘নাটকীয় বণ্টন’ দেখিয়েছেন, খতিয়ানে সেই অনুপাত বা নামের ধারাবাহিকতা নেই। এটি স্রেফ বিবাদী পক্ষের ৫ শতক জমি আত্মসাৎ করার জন্য তৈরি করা একটি বানোয়াট চিত্রনাট্য।
৬. শতবর্ষের নিরবচ্ছিন্ন আদি দখল: বিবাদী পক্ষ ১৯৩৬ সাল থেকে জোট জমিদারের নিকট থেকে ৩ শতক পত্তন এবং খাজনা পরিশোধ সাপেক্ষে ৫ শতকসহ মোট ০৮ শতক জমিতে শত বছর ধরে শান্তিপূর্ণ বসবাস ও ব্যবসা পরিচালনা করছে।
৭. ঐতিহাসিক খাজনা রশিদের গুরুত্ব: আমাদের কাছে ১৩৪৬ থেকে ১৩৬০ বাংলা সনের ধারাবাহিক খাজনা রশিদ রয়েছে, যা প্রমাণ করে এই ০৮ শতক জমি শুরু থেকেই বাদীদের দালিলিক সীমানার বাইরে আমাদের বৈধ এখতিয়ারে।
৮. কমিশন রিপোর্টের অকাট্য প্রমাণ: আদালতে দাখিলকৃত কমিশন রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, বিবাদী পক্ষ পৃথকভাবে ৮ শতক জমিতে স্থাপনা ও সীমানা প্রাচীর নিয়ে দখলে আছে। যেখানে দখল ও খাজনা পরিশোধের ইতিহাস রয়েছে, সেখানে বাদীদের কাল্পনিক খতিয়ান মূল্যহীন।
৯. বাইশ বছরের দীর্ঘ ভোগান্তি ও হয়রানি: ২০০৪ সালে দায়ের করা এই ভিত্তিহীন মামলার কারণে একটি পরিবার আজ ২২ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় হয়রানির শিকার। আরজি দৃষ্টেই প্রমাণিত হয় যে, বাদীরা কড়া-গণ্ডার হিসাবে কারসাজি করে আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে।
১০. আত্মসাতের হীন উদ্দেশ্য: সার্বিক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় :যে, বিবাদীদের ২১ শতকের দাবি মূলত বিবাদী পক্ষের বৈধ ৫ শতক জমি ‘গিলে ফেলার’ একটি আইনী চক্রান্ত। দলিল কম থাকা সত্ত্বেও যোগফলে কারসাজি করা এই মামলার মূল ভিত্তিহীনতাকে প্রমাণ করে।
উক্ত মামলার আরজি ও দাখিলকৃত নথিপত্র পর্যালোচনায় পক্ষগুলোর দাবি অনুযায়ী যে হিসাব ও দলিলগত অসংগতি তুলে ধরা হয়েছে, তা থেকেই বিতর্কিত বিষয়গুলোর সূত্রপাত হয়েছে বলে বিবাদী পক্ষের বক্তব্য। তাদের মতে, মুখের ব্যাখ্যার চেয়ে নথিপত্রের বিশ্লেষণেই পুরো ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়।
এই অবস্থায় বিবাদী পক্ষ দাবি করেছে যে, নথিতে উপস্থাপিত হিসাব-নিকাশ ও দলিলের ব্যাখ্যায় যেসব অসঙ্গতি রয়েছে, সেগুলো বিচারিকভাবে নিরূপণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা মামলাটিকে ভিত্তিহীন দাবি করে ৫২/০৪ নম্বর বাটোয়ারা মামলাটি খারিজের আবেদন জানিয়েছে।
তাদের মতে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের সঠিক নিষ্পত্তির জন্য বিষয়টি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। সূত্র: ল’ ইয়ার্স ক্লাব
সিভি/এম

