আগামী ১৩ ও ১৪ মে অনুষ্ঠিতব্য সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে অংশগ্রহণ ও প্রার্থিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। যদিও তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাচ্ছেন—তবুও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আইন অঙ্গনে।
গত রোববার তলবি সভার নামে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে—যেখানে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের উপস্থিতি ছিল—সিদ্ধান্ত হয়, দলীয় কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা সংগঠিতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। তবে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ রাখা হয়।
এই সুযোগে আওয়ামীপন্থি পরিচিত ২০ জন আইনজীবী মনোনয়নপত্র জমা দেন। মঙ্গলবার মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি তাদের সবকটি মনোনয়ন বাতিল করে দেয়।
গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বৈধ প্রার্থী তালিকায় কেবল বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি সমর্থিত আইনজীবীরাই রয়েছেন। ফলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের এই নির্বাচন কার্যত নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
জেলা বার নির্বাচনগুলোর চিত্র:
এর আগে বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। যেসব নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা সংগঠিতভাবে অংশ নিতে পেরেছেন, সেখানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। উদাহরণ হিসেবে, ২ এপ্রিল কুমিল্লা জেলা বার নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত একক প্যানেলে অংশ নিয়ে ১৫টির মধ্যে ১৩টি পদে জয় পায়। সেখানে জামায়াত সভাপতি পদে এবং বিএনপি সাধারণ সম্পাদক পদে জয়ী হয়। আওয়ামীপন্থিরা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুটি পদে জয় পান।
একই দিনে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১১টি পদে বিএনপি পূর্ণ প্যানেলে জয়লাভ করে। সেখানে আওয়ামীপন্থি প্রার্থীরা স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগও পাননি। জামায়াতপন্থি আইনজীবীরাও কোনো আসনে জয়ী হতে পারেননি।
চলমান ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগও সীমিত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে বিএনপি ও জামায়াত পৃথক প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এরই মধ্যে জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনী ব্যবস্থার অনিয়ম, পক্ষপাত এবং কমিটি গঠনে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ তোলেন। তিনি নির্বাচন কমিশনের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি দেশের অন্যান্য বার সমিতির তুলনায় ঐতিহাসিকভাবে ভিন্ন মর্যাদা বহন করে আসছে। বিশেষ করে ১৯৮০–৯০ দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই সমিতির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আন্দোলনের সময় আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবী শক্তিকে একত্র করতে ভূমিকা রাখে। সেই সময়ের নেতৃত্বে থাকা আইনজীবীরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরও দীর্ঘ সময় সুপ্রিম কোর্ট বার নিয়মিত নির্বাচন আয়োজন করে এসেছে। তবে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ওঠে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে পেশাজীবী সংগঠনগুলোতে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক বাড়ে। ২০২৩ সালের নির্বাচনকে ঘিরেও ব্যাপক সমালোচনা হয়, যা আইন অঙ্গনে প্রশ্ন তৈরি করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন কি ধীরে ধীরে একপক্ষীয় হয়ে পড়ছে? আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার যুক্তি হিসেবে তাদের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হলেও সমর্থকদের অংশগ্রহণ নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও বাদ দেওয়ার ঘটনা নির্বাচনী অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের এই প্রবণতা ভবিষ্যতে অন্যান্য স্থানীয় ও পেশাজীবী সংগঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, একতরফা নির্বাচন হলে তা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তারা আরও বলছেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সিভি/এম

