বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আইন অঙ্গনে বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রশ্নটি হলো— কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান কি আলাদা Power of Attorney ছাড়া শুধুমাত্র বন্ধক দলিলের ভিত্তিতে আদালতের বাইরে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি করতে পারে?
অনেক ব্যাংকার ও আইনজীবীর ধারণা, এটি সম্ভব নয়। তবে বিদ্যমান আইন ও পরবর্তী সংশোধনী বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ধারা ১২ অনুযায়ী বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। এগুলো হলো আদালতের মাধ্যমে নিলাম, আদালতের বাইরে বিক্রয় এবং বিক্রি সম্ভব না হলে সম্পত্তির দখল ও স্বত্ব ডিক্রিধারীর অনুকূলে ন্যস্ত করা। এই তিনটির মধ্যে আদালত-বহির্ভূত বিক্রয় পদ্ধতি নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক দেখা যায়।
আইনের ধারা ১২(৩) অনুযায়ী, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ দেয় এবং বন্ধক প্রদানের সময় সম্পত্তি বিক্রির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া থাকে, তাহলে সেই সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা না করে সরাসরি মামলা করা যাবে না। অর্থাৎ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া শুধু একটি সুযোগ নয়, বরং আদালতে যাওয়ার আগে এটি একটি বাধ্যতামূলক ধাপ। মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে “বিক্রয়ের ক্ষমতা” কীভাবে প্রদান করা হবে, তা নিয়ে।
প্রথমদিকে আইনের ধারা ১২(৩)-এ “বিক্রয়ের ক্ষমতা” শব্দের পাশে বন্ধনীতে “Power of Attorney” উল্লেখ ছিল। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে আলাদা Power of Attorney নেওয়ার প্রচলন তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে সেটিকে বাধ্যতামূলক বলে মনে করা শুরু হয়।
কিন্তু ২০১০ সালে অর্থ ঋণ আদালত (সংশোধন) আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ধারা ১২(৩) থেকে “Power of Attorney” শব্দটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত পরিবর্তন ছিল না; বরং সংসদের সচেতন সিদ্ধান্ত। এই সংশোধনীর মাধ্যমে মূলত পরিষ্কার করা হয়েছে যে, বন্ধক দলিলেই যদি সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, তাহলে আলাদা Power of Attorney প্রয়োজন হবে না।
Transfer of Property Act, 1882-এর ধারা ৬৯ অনুযায়ীও mortgagee-এর বিক্রয় ক্ষমতা কার্যকর হওয়ার জন্য registered instrument-এ express power of sale উল্লেখ থাকাই যথেষ্ট। যেহেতু বন্ধক দলিল নিজেই একটি নিবন্ধিত দলিল, তাই সেখানে স্পষ্ট বিক্রয় ক্ষমতা থাকলে আইনের শর্ত পূরণ হয়ে যায়।
আইনজীবীদের মতে, একটি সঠিকভাবে প্রস্তুতকৃত বন্ধক দলিলে সাধারণত উল্লেখ থাকে যে, ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান private treaty বা auction-এর মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে এবং প্রয়োজনে আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। এ ধরনের শর্ত অর্থ ঋণ আদালত আইন ও Transfer of Property Act— উভয়ের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে বাস্তব ক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা দীর্ঘদিন ধরে দেখা যায়। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অনেক সময় Power of Attorney ছাড়া বিক্রয় দলিল নিবন্ধনে সমস্যা তৈরি হয়। যদিও আইনটির ধারা ১২(৮) এই বিষয়ে বিশেষ সুরক্ষা দিয়েছে। এই উপধারায় বলা হয়েছে, mortgage-এর অধীনে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো জামানতী সম্পত্তি বিক্রি করলে সেই বিক্রয় ক্রেতার পক্ষে বৈধ স্বত্ব সৃষ্টি করবে এবং তা সহজে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।
এছাড়া একই আইনের ধারা ৩-এ overriding provision রয়েছে। অর্থাৎ অন্য কোনো আইনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে অর্থ ঋণ আদালত আইনের বিধানই প্রাধান্য পাবে। ফলে Registration Act-সহ অন্য আইনি বাধা এখানে কার্যত সীমিত হয়ে যায়। তবে আইনে ঋণগ্রহীতার জন্য প্রতিকারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ধারা ১২(৮)-এর proviso অনুযায়ী, বিক্রয় প্রক্রিয়ায় অবৈধতা বা পদ্ধতিগত অনিয়ম থাকলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাবে।
অবৈধতার উদাহরণ হতে পারে— বন্ধক দলিলে বিক্রয় ক্ষমতা উল্লেখ না থাকা, ঋণ পরিশোধ হয়ে যাওয়ার পরও সম্পত্তি বিক্রি করা কিংবা বন্ধকের বাইরে থাকা সম্পত্তি বিক্রি করা। অন্যদিকে পদ্ধতিগত অনিয়ম বলতে বোঝায়— যথাযথ নোটিশ না দেওয়া, আইনি বিজ্ঞপ্তির শর্ত লঙ্ঘন করা বা অস্বাভাবিক কম মূল্যে সম্পত্তি বিক্রি করা।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব ক্ষেত্রে আইন বিক্রয় বাতিলের সুযোগ দেয়নি। বরং ক্ষতিপূরণের পথ খোলা রেখেছে। আইন বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে একদিকে ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে, অন্যদিকে ঋণগ্রহীতার প্রতিকার পাওয়ার অধিকারও বজায় রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান আইনি অবস্থান হলো— ২০১০ সালের সংশোধনীর পর অর্থ ঋণ আদালত আইনের অধীনে আদালতের বাইরে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির জন্য আলাদা Power of Attorney বাধ্যতামূলক নয়। তবে বন্ধক দলিলে বিক্রয় ক্ষমতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে, দলিল নিবন্ধিত হতে হবে, ঋণ খেলাপি হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হতে হবে এবং আইনে নির্ধারিত নোটিশ ও বিজ্ঞপ্তির বিধান অনুসরণ করতে হবে।
এসব শর্ত পূরণ হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আদালতে না গিয়েও বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে এবং সেই বিক্রয় আইনগতভাবে বৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি দূর করতে আইনটির সংশোধনী ও ধারাগুলোর সমন্বিত ব্যাখ্যাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র: ল’ ইয়ার্স ক্লাব
সিভি/এম

