নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা এবং অবিচার রোধের লক্ষ্য নিয়েই জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল—এমন মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এখন এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যেখানে বিচারপতি বা বিচারকদের একাধিকবার ভাবতে হচ্ছে, কাউকে জামিন দেওয়া উচিত কি না।
গত রোববার (৩ মে) বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে (আইডিইবি) এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত দিনব্যাপী জাতীয় কনভেনশনের তৃতীয় পর্বে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সারা হোসেনের ভাষ্য, এমন ব্যক্তিকেও আটকে রাখা হচ্ছে যার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান সাক্ষ্য–প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়নি। তাঁর মতে, এই বাস্তবতা বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সঠিক ও স্বচ্ছ বিচার অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা এবং তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব নিয়ে তিনি উদ্বেগ জানান। তাঁর প্রশ্ন, সাক্ষ্য–প্রমাণ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে আটক রাখা কি শহীদদের প্রতি সুবিচার, নাকি তা প্রহসনে পরিণত হচ্ছে? একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত করেন, কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও কাজ করছে বলে মনে হতে পারে।
মানবাধিকারের প্রসঙ্গ তুলে সারা হোসেন বলেন, এটি একটি সর্বজনীন এবং অবিভাজ্য ধারণা। শুধু বাকস্বাধীনতা নয়, জীবনের অধিকার, গুম ও নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বাস্তবে সব নাগরিক সমানভাবে এসব অধিকার ভোগ করছেন কি না, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। বিশেষ করে ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ সমানভাবে হচ্ছে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিসের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অতীতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেক দিন পর আদালতে হাজির করা হতো এবং পরে তাঁরা জামিন পেতেন। তবে সেখান থেকেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হতো। বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন অনেক ক্ষেত্রে জামিন প্রক্রিয়াই শুরু হচ্ছে না, বরং জামিন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রকট—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলের নির্বাচন প্রসঙ্গেও সমালোচনা করেন সারা হোসেন। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অভিযোগ নেই, তাঁরা নিয়মিত আদালতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়া বাকস্বাধীনতার প্রশ্নও তৈরি করছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে এবং সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিনের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই পর্বে আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, জাইমা ইসলাম, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম এবং মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ আমান। বক্তারা জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা বাস্তবায়ন এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
- সারা হোসেন: সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী

