সামাজিক চুক্তি ও ন্যাচারাল জাস্টিস কি উপেক্ষিত? ন্যায়বিচার কি কেবল আইনের অক্ষর পালনে, নাকি নাগরিকের ভোগান্তি লাঘবে?
২০১২ সালে সংশোধিত হাইকোর্ট রুলসে বন্দি ৩০ ও ৪৫ দিনের ‘হলফনামা’র মেয়াদ আজ বিচারপ্রার্থীদের জন্য এক নীরব আর্থিক জুলুম ও পদ্ধতিগত ফাঁদে পরিণত হয়েছে, যদিও ভারত ও পাকিস্তান পুরনো নিয়মেই সুফল পাচ্ছে। বাংলাদেশের বিচারিক বাস্তবতায় এই আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিগত দেয়াল ভেঙে জনগণের জন্য ন্যায়বিচারকে সহজলভ্য করার এখনই সময়। যখন আদালতের দীর্ঘ ছুটি আর প্রশাসনিক পুনর্গঠনের দায় বিচারপ্রার্থীর কাঁধে দ্বিগুণ আর্থিক দণ্ড হয়ে চাপে, তখন পরিবর্তন কেবল প্রয়োজন নয়, অনিবার্য হয়ে ওঠে।
৪৫ দিনের সীমা: ন্যায়বিচারের পথে এক প্রাতিষ্ঠানিক বাধা:
ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায় ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ কতটা জনবান্ধব, তার ওপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে বর্তমানে বিচারপ্রার্থীদের জন্য অন্যতম বড় এক বিড়ম্বনার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘এফিডেভিট’ বা হলফনামার মেয়াদের সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট ডিভিশন) রুলস, ১৯৭৩ অনুযায়ী, একটি রিট পিটিশনের ক্ষেত্রে হলফনামার বয়স “লাইফ টাইম” বা মেয়াদ ৩০ দিন এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি মোশনের ক্ষেত্রে তা ৪৫ দিন।
কারণ হলো, এই সময়ের মধ্যে সেই রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে অন্য কোনো পক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না বা আদেশের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া। আইনত এটি ফাইলিংয়ের সময়সীমা হলেও, দীর্ঘ অবকাশ বা প্রশাসনিক জটিলতায় এই সময় পার হয়ে গেলে যে অবর্ণনীয় ভোগান্তি তৈরি হয়, তা আজ এক নীরব জুলুমে পরিণত হয়েছে। উপেক্ষিত হচ্ছে সামাজিক চুক্তি ও প্রিন্সিপালস অব ন্যাচারাল জাস্টিস। এ যেন বাতির নিচে অন্ধকার! বহুদিন যেন দেখা হয় না চক্ষু মেলিয়া!
রুলসের পটভূমি ও ইতিহাস: বৃটিশ-১৯৪৭-২০২৬:
১৯৪৭ সালের ‘হাইকোর্ট (বেঙ্গল) অর্ডার’-এর মাধ্যমে তদানীন্তন ইস্ট বেঙ্গল হাইকোর্ট (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট) প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সূচনালগ্নে এই আদালতের নিজস্ব কোনো বিধিবদ্ধ নিয়মাবলী ছিল না; বরং ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্টের অব্যবহিত পূর্বে কলকাতা হাইকোর্ট যে প্র্যাকটিস ও প্রসিডিওর অনুসরণ করত, তাকেই এ আদালতের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের ১৯৫০ সালের ফেডারেল কোর্ট রুলস এবং ১৯৫৬ সালের সুপ্রিম কোর্ট রুলস উচ্চ আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ব্রিটিশ আমলের নিয়মগুলো পরিবর্তিত সামাজিক ও আইনি বাস্তবতায় ক্রমশ সেকেলে ও অচল হয়ে পড়ে। এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ১৯৫৮ সালের ১৮ই জুলাই এক ‘ফুল কোর্ট’ সভায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট, ঢাকা, প্রচলিত নিয়ম ও আদেশগুলোকে যুগোপযোগী ও প্রয়োজনীয় সংশোধন সাপেক্ষে নিজস্ব নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করে।
১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পবিত্র সংবিধান গৃহীত হয়। সংবিধানের ১০৭ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টকে বিধি প্রণয়নের যে অগাধ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই ১৯৭৩ সালে ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট ডিভিশন) রুলস’ প্রণয়ন ও প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘ চার দশক পর, ২০১২ সালে এই বিধিমালাকে সময়োপযোগী করা হয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এটি প্রতীয়মান হয় যে, বিদ্যমান অনেক নিয়মই এখনকার বৈশ্বিক মানদণ্ড, বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও ডিজিটাল বাস্তবতায় কিছুটা স্থবির। তাই সময়ের চাহিদায় একে আরও আধুনিক, বাস্তবমুখী, পরিশীলিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বিশ্বমানের করার দাবি এখন সময়ের দাবি।
|
হলফনামা দাখিলের সময়সীমা: ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমানের আইনি বিবর্তন:
ব্রিটিশ কলোনিয়াল সময়কাল থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের প্র্যাকটিস ও প্রসিডিওরে হলফনামা দাখিলের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ও নমনীয় নীতি প্রচলিত ছিল। সেই বিধান অনুযায়ী, যেখানে হলফনামা দাখিলের জন্য বিশেষ সময়সীমা নির্ধারিত থাকত, সেখানে আদালতের অনুমতি ব্যতিরেকে উক্ত সময়ের পরে দাখিলকৃত কোনো হলফনামা ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ, আদালতের বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে নির্ধারিত সময়ের পরেও হলফনামা দাখিলের সুযোগ উন্মুক্ত ছিল।
এই ধারাবাহিকতা ১৯৪৭ সালের হাইকোর্ট (বেঙ্গল) অর্ডার, পাকিস্তানের ১৯৫০ সালের ফেডারেল কোর্ট রুলস এবং ১৯৫৬ সালের সুপ্রিম কোর্ট রুলসেও বজায় ছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের ‘ফুল কোর্ট’ সভা গ্রহণ করে। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট ডিভিশন) রুলস’-এ একই নীতি অনুসরণ করা হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান আজও তাদের আধুনিক সুপ্রিম কোর্ট রুলসে (যথাক্রমে ২০১৩ ও ২০২৫) এই সনাতন ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধানটি বজায় রেখেছে।
তবে উপমহাদেশের দীর্ঘ বিচারিক ইতিহাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০১২ সালে। সেই বছরের সংশোধনীর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো হলফনামা দাখিলের ক্ষেত্রে ৩০ ও ৪৫ দিনের একটি কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। যদিও এই বিধানের পেছনে বিচারপ্রক্রিয়ায় গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি মহৎ প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু বর্তমানে তা বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি বাস্তবিক সমস্যা ও ন্যায়বিচারের পথে অন্তরায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
অথচ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (আপিলেট ডিভিশন) রুলস, ১৯৮৮-এর অর্ডার ৮ রুল ১৩-তে এখনও সেই প্রাচীন ও উদার নীতিটিই বিদ্যমান রয়েছে, যেখানে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে বিলম্বে হলফনামা গ্রহণের সুযোগ আছে। রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের ন্যায়বিচারের যে সামাজিক চুক্তি বিদ্যমান, তার সফল বাস্তবায়নের জন্য এই আইনি প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক, জনবান্ধব ও কণ্টকমুক্ত করা প্রয়োজন। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে হলফনামা দাখিলের এই কঠোর সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করে একে আরও মানসম্মত ও বাস্তবসম্মত করা এখন সময়ের দাবি।
রুলস প্রয়োগ ও বর্তমান সংকট:
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন রুলসের চ্যাপ্টার আইভিএ এর বিধি ৪, ৫ ও ৬ অনুযায়ী, হলফনামা সম্পাদনের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদনটি উপযুক্ত বেঞ্চে দাখিল বা উত্থাপন করতে হয়। অন্যথায় সেই হলফনামার বৈধতা উত্তীর্ণ বা ‘তামাদি হয়ে যায়। ১৯৭৩ সালে যখন এই রুলস প্রণীত হয়েছিল, তখন জনসংখ্যা ও মামলার যে অনুপাত ছিল তা আজকে ২৪ গুণ বেড়েছে! এই বাড়তি চাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট সংখ্যক বিচারপতি থাকা ও প্রত্যাশিত ডিসপোজাল না হওয়ায় ৩০ এবং ৪৫ দিনের সীমাবদ্ধতা বিচার প্রার্থীদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়েছে!
সুপ্রীম কোর্ট বার্ষিক রিপোর্ট ২০২৪ অনুসারে ১৯৭৩ সালে, যে বছর এই রুলস প্রকাশিত হয়, সে বছর, হাইকোর্ট ডিভিশনে নতুন ফাইলিং ছিল ৫,৬৫৪ টি, ডিসপোজাল বি নিষ্পত্তি ছিল ৩,৬৫৭ টি এবং পেন্ডিং মামলার সংখ্যার জের ছিল ২৪,০৬৩ টি। যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেড়ে নতুন ফাইলিং ৮২,০৮২ টি, ডিসপোজাল ৩৮,২৯৭ টি এবং পেন্ডিং মামলার সংখ্যা হলো ৫,৮৯,৬৫১ টি। গড়ে ২৫ গুন বেড়েছে পেন্ডিং মামলার সংখ্যা।
হাইকোর্ট বিভাগ বছরে প্রায় ১৮০ দিনেরও অধিক সময় বন্ধ থাকে। সম্প্রতি মার্চ-এপ্রিল ব্যাপী ৩৭ দিনের দীর্ঘ অবকাশ শেষে আদালত খোলার পর দেখা গেছে, শত শত আবেদনের হলফনামার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। এর সাথে যোগ হয় নিয়মিত বেঞ্চ পুনর্গঠন ও জুরিসডিকশন পরিবর্তন। দেখা যায়, একটি আবেদন সঠিক সময়ে করা হলেও প্রশাসনিক কারণে শুনানি হতে হতে ৪৫ দিন পার হয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক তখনই আদালত সেই ‘তামাদি’ হলফনামা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।
আর্থিক দণ্ড ও মানবিক বিপর্যয়:
এই ৩০ বা ৪৫ দিনের আইনি বেড়াজালে আটকা পড়ে একজন বিচারপ্রার্থীকে যে চড়া মূল্য দিতে হয়, তা অমানবিক। প্রথমত, তাকে পুনরায় নিম্ন আদালত থেকে নতুন সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে হয়, যা সংগ্রহ করতে ১৫-২০ দিন সময় ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়। এরপর উচ্চ আদালতে পুনরায় এফিডেভিট, নতুন করে ফাইলিং এবং বার অ্যাসোসিয়েশন ফি দ্বিতীয়বার প্রদান করতে হয়। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কারণে বা আদালতের দীর্ঘ ছুটির ফলে সৃষ্ট বিলম্বের দায়ভার কেন একজন নাগরিককে দ্বিগুণ আর্থিক দণ্ড দিয়ে শোধ করতে হবে? এটি কেবল আইনি জটিলতা নয়, বরং বিচারপ্রার্থীর ওপর এক প্রকার ‘ডাবল ট্যাক্সেশন’ বা দ্বিগুণ আর্থিক শোষণের শামিল।
বৈশ্বিক অবস্থানে আমরা কি পিছিয়ে?
বিশ্বের উন্নত বিচারব্যবস্থাগুলো এখন ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের চূড়ান্ত পর্যায়ে। আমেরিকা, সিঙ্গাপুর বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে সার্টিফাইড কপির এফিডেভিট নিয়ে এমন আদিম জটিলতা নেই। সেখানে ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে আদালত সরাসরি অনলাইনেই আদেশের সত্যতা যাচাই করে নেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত বা পাকিস্তানেও পুরনো কপির ক্ষেত্রে আইনজীবীর একটি সংক্ষিপ্ত আন্ডারটেকিং বা হলফনামা যথেষ্ট হিসেবে গণ্য হয়। অথচ আমরা ৫৩ বছরের পুরনো একটি বিধিমালা আঁকড়ে ধরে আছি, যা বর্তমানের মামলাজট ও জনসংখ্যার চাপে কার্যকারিতা হারিয়েছে।
তামাদি আইনের স্পিরিট নষ্ট:
তামাদি আইন ১৯০৮ দ্বারা যে কোন মামলা ফাইলিং, আপীল ও অন্যান্য আবেদনের ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ করলেও বিলম্ব মার্জনার সুযোগ আছে। ১৯৭৩ এর রুলসে ২০১২ সালে সংশোধনী দ্বারা যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে তা কখনো বিলম্ব মার্জনা হয় আবার কখনো হয় না, তাই, বাস্তবতার সাথে অচল ও ন্যায়বিচার পরিপন্থী এই নিয়মে সমতা দরকার বলে মনে হয়।
প্রয়োজনীয় পরিবর্তন প্রস্তাবনা: এই জটিলতা নিরসনে আমাদের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বেশ কিছু সম্ভাব্য বিকল্প ধারণা তুলে ধরলাম:
রুলস সংশোধন : প্রধান সমাধান
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট সংবিধানের ১০৭ (১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট ডিভিশন) রুলস, ১৯৭৩’ এর প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে পারে। বিধিমালার আইভিএ পার্টে বিধি ৪ (৪), ৫ (৬) ও ৬ (৬) এ বর্ণিত এফিডেভিট সংক্রান্ত ৩০ ও ৪৫ দিনের সীমাবদ্ধতা সংশোধন বা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে, পার্ট আইএ বিধি ৭ক অনুসারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রুল কমিটি ফুল কোর্টে বিবেচনার জন্য একটি সুপারিশ পেশ করতে পারে।
বর্তমান জনসংখ্যা ও মামলাজটের অনুপাত এবং আদালত প্রশাসনের বহুমুখী সমস্যার কথা সামনে রেখে এই সীমাবদ্ধতার মেয়াদকে রিট পিটিশনের ক্ষেত্রে ৬০ দিন এবং দেওয়ানী ও ফৌজদারি মোশনের ক্ষেত্রে ৯০ দিন করা হলে এই সমস্যা সমাধান হবে বলে অংশীজনেরা মনে করেন। এই সংশোধনী প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য হলো একবার এফিডেভিট করা হলে আবেদনটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নানা কারণে বিলম্ব হলেও দ্বিতীয়বার এফিডেভিট করার প্রয়োজন হবে না। ফলে আদালতের প্রশাসনিক কাজ থাকবে স্থিতিশীল , বিচারপ্রার্থীদের মূল্যবান সময় ও অর্থ বাঁচবে এবং ন্যায়বিচারের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হবে।
প্র্যাকটিস ডাইরেকশনস জারি: সাময়িক সমাধান
রুলসের চ্যাপ্টার আইআইআইবি এর বিধি ১ অনুসারে আদালতের বিচারিক ও সংশ্লিষ্ট কার্যাবলী সুষ্ঠু ও দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি সময় সময় প্রয়োজনীয় প্র্যাকটিস ডাইরেকশনস জারি করতে পারেন যা বিধিমালার অন্যান্য বিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এফিডেভিট বৈধতার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে কিছু আদালত তা গ্রহণ করে এবং কিছু আদালত তা গ্রহণ করে না। এই বৈষম্য নিরসনে একটি নির্দেশনার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যে, একবার বৈধভাবে দাখিলকৃত এফিডেভিট মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো ২০১২ সালে প্র্যাকটিস ডাইরেকশনস জারির ক্ষমতা দিয়ে সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পর আজও পর্যন্ত কোন ডাইরেকশনস জারি হয় নাই।
আইনজীবীর প্রত্যয়ন বা হলফনামা গ্রহণ: বিকল্প সমাধান
৩০ বা ৪৫ দিন বিধানের আরেকটি উদ্দেশ্য হল ইতোমধ্যে অধস্তন আদালতে এ মামলার সর্বশেষ আদেশের অবস্থান জানা। যদি আদালত আদেশের বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত হতে চায়, তবে নতুন করে কপি উত্তোলনের বাধ্যবাধকতা আরোপ না করে আবেদনকারী আইনজীবীর একটি ‘সংক্ষিপ্ত হলফনামা’ বা ‘সার্টিফিকেট’ গ্রহণ করা, যেখানে তিনি বর্তমান আদেশের স্থিতি অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। ভারত ও পাকিস্তানে এফিডেভিট বিষয়ে এ ধরণের প্রাকটিস চলমান আছে। আমাদের দেশে কালেভদ্রে মেনশন করে এটি গৃহীত হলেও এ বিষয়ে সর্বজনীন সমঝোতা দরকার।
দিন গণনা সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দান: বিকল্প সমাধান
কোন কারনে ৪৫ দিনের সীমা এখনই পরিবর্তন করতে না পারলে দিন গণনার ক্ষেত্রে ক্লারিফিকেশন জারি করা। সার্টিফাইড কপির গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি নির্দেশনা যোগ করা; যেখানে সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ অবকাশ, সরকারি সাধারণ ছুটি এবং প্রশাসনিক কারণে বেঞ্চ পুনর্গঠন বা জুরিসডিকশন পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট মধ্যবর্তী সময়কে ‘অতিক্রান্ত সময়’ হিসেবে গণ্য না করার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা। মূলত আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকা বা প্রশাসনিক জটিলতার দিনগুলোকে বাদ দিয়ে প্রকৃত কার্যদিবসের ভিত্তিতে সময় গণনার বিধান জারি করা, যাতে বিচারপ্রার্থীগণ কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
আর্থিক ও পদ্ধতিগত সমন্বয়: সহায়ক সমাধান
আরেকটি বিকল্প হতে পারে প্রশাসনিক কারণে (যেমন: কোর্ট পরিবর্তন বা দীর্ঘ অবকাশ) পুনরায় কোনো আবেদন দাখিল করার প্রয়োজন হলে, উক্ত মামলার জন্য ইতিপূর্বে পরিশোধিত বার অ্যাসোসিয়েশন ফি, এফিডেভিট ফি ও সরকারি স্ট্যাম্প ফি নতুন আবেদনে স্থানান্তর বা সমন্বয় করার নির্দেশনা রাখা, যাতে বিচারপ্রার্থীরা দ্বিগুণ আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি পায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এইগুলি বাস্তবায়ন করা কঠিন তবে অসম্ভব নয়!
স্বয়ংক্রিয় ফাইল ট্রান্সফার ব্যবস্থা: সহায়ক সমাধান
আদালতের জুরিসডিকশন বা বেঞ্চ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মামলার সকল মূল নথি ও সার্টিফাইড কপি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন বেঞ্চে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা, যাতে বিচারপ্রার্থীকে নতুন করে ফাইলিং ও কজলিসট সংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে না হয় এবং যৌক্তিক সময়ে আবেদন নিষ্পত্তি সম্ভব হয়।
অনলাইন ভেরিফিকেশন প্রস্তুতি: সহায়ক সমাধান
ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হিসেবে অধস্তন আদালতসমূহের অনলাইন কজলিস্ট ও ডিজিটাল রেকর্ড সিট যাচাইয়ের মাধ্যমে আদেশের সত্যতা ও মামলার বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করার প্রথা চালু করা, যাতে কাগজের নথির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিচারিক সময় সাশ্রয় করা সম্ভব হয়।
শেষকথা: পরিবর্তন শুরুর এখনই সময়
বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যায়বিচারকে সহজলভ্য করা, জটিল করা নয়। ১৯৭৩ সালের যখন রুলস তৈরি হয়েছিল, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে এবং প্রচণ্ড মামলাজটের প্রেক্ষাপটে এই ৩০ বা ৪৫ দিনের সীমাবদ্ধতা বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি ‘প্রসেসিউরাল ট্র্যাপ’ বা পদ্ধতিগত ফাঁদ (অবিচার) ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা আশা করি, অংশীজনদের সুযোগ্য নেতৃত্বে এবং অভিভাবকত্বে এই আমলাতান্ত্রিক ও পদ্ধতিগত বাধাগুলো দূর হবে। বিচারালয় হোক মানুষের স্বস্তির জায়গা।
দীর্ঘকাল ধরে উপেক্ষিত ও অবহেলিত এই পরিবর্তনের মাধ্যমে বিচার বিভাগে এক নতুন যুগের সূচনা হোক, এটাই হোক আমাদের বিনীত প্রত্যাশা। একজন ভুক্তভোগী ও সচেতন আইনজীবী হিসেবে শুধুমাত্র ন্যায়বিচারের পথকে আরও সুগম করার গভীর আকাঙ্ক্ষা থেকেই এই বিনীত প্রস্তাবনা পেশ করছি। আমার এই নিবেদন আপনার সদয় বিবেচনায় স্থান পেলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
- লেখক—অ্যাডভোকেট মীর হালিম: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও পাবলিক পলিসি অ্যানালিস্ট।

