দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা একসঙ্গে পদত্যাগ করার পর দীর্ঘ সময় কমিশন অকার্যকর হয়ে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে এবার দুদক আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন খসড়ায় কমিশনের মেয়াদ কমানো থেকে শুরু করে দুদকের ক্ষমতা ও এখতিয়ার বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কমিশন না থাকলেও যেন কার্যক্রম বন্ধ না হয়, সে ব্যবস্থাও যুক্ত করা হচ্ছে।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, সংশোধনী আইনের একটি খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি প্রথমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। পরে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। অনুমোদন পেলে তা বিল আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন খসড়ায় কমিশনের মেয়াদ, কমিশন শূন্য থাকলে করণীয় এবং কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে কমিশন না থাকলেও দুদকের কার্যক্রম বন্ধ হবে না এবং প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতাও বাড়বে।
বর্তমান আইনে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তা কমিয়ে চার বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ পাওয়া ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করে। এরপর প্রায় আড়াই মাস ধরে কমিশনশূন্য অবস্থায় দুদকের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। মামলা দায়ের, অভিযোগপত্র অনুমোদন এবং অভিযান পরিচালনাসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কারণ বিদ্যমান আইনে এসব ক্ষমতা কেবল কমিশনের হাতেই রয়েছে।
এই পরিস্থিতি এড়াতে দুদক আইনের ১০ ধারায় নতুন একটি উপধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অনিবার্য কারণে কমিশন পুরোপুরি শূন্য হয়ে গেলে কমিশনের সচিব মহাপরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। পরে নতুন কমিশন গঠিত হলে সেই কার্যক্রম কমিশনকে জানাতে হবে। সচিবের নেওয়া সিদ্ধান্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত হিসেবেই গণ্য হবে।
দুদকের সূত্র আরও জানিয়েছে, সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আইন সংশোধনের বিষয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মে দুদকের সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীমের নেতৃত্বে মহাপরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভার সুপারিশের ভিত্তিতেই সংশোধনী খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
খসড়ায় দুদকের ক্ষমতা ও কাজের পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অর্থ পাচারবিষয়ক অপরাধ মোকাবিলায় দুদকের এখতিয়ার বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ পাচারের অপরাধ দুদকের আওতায় থাকলেও নতুন প্রস্তাবে সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, প্রতারণা, জালিয়াতি, দলিল জালকরণ, দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার, শুল্ক ও কর-সংক্রান্ত অপরাধ এবং পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত অপরাধও দুদকের তদন্তসীমার মধ্যে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বহুল আলোচিত দুদক আইন, ২০০৪-এর ৩২(ক) ধারা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এই ধারায় বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে বিশেষ বিধান মানার কথা বলা ছিল। উচ্চ আদালত আগেই ধারাটি অবৈধ ঘোষণা করায় সেটি বাতিলের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তদন্ত শেষ করার সময়সীমা নিয়েও পরিবর্তনের সুপারিশ এসেছে। বর্তমানে ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংশোধনীতে সেই বিধান বাতিল করে নতুন ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে গোপন অনুসন্ধান পরিচালনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং বিদেশি নাগরিকত্বধারীদের কমিশনার পদে অযোগ্য ঘোষণার বিষয়ও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগসংক্রান্ত ২৮(গ) ধারা বাতিলের মাধ্যমে। বিদ্যমান ধারায় ভিত্তিহীন তথ্য দিলে সেটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার বিধান রয়েছে।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম মনে করেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কার্যকর হলে দুদকের ক্ষমতা ও কার্যকারিতা অনেক বাড়বে। তাঁর ভাষ্য, এসব পরিবর্তন প্রতিষ্ঠানটিকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

