সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১৪টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সম্পাদকসহ ১৩টিতেই জয় পেয়েছে বিএনপি-সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী প্যানেল (নীল প্যানেল)। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলীয় জোটের আইনজীবী ঐক্য প্যানেল (সবুজ প্যানেল) পেয়েছে মাত্র একটি সদস্য পদ।
ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, সভাপতি পদে নীল প্যানেলের প্রার্থী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ২ হাজার ৯৮৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের আবদুল বাতেন পান ৭৮৮ ভোট। নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয় গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। মাঝখানে এক ঘণ্টা বিরতি ছিল। ভোট গণনা শুরু হয় রাত ১০টার দিকে। পরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে রাত ২টার দিকে ফল ঘোষণা করেন নির্বাচন পরিচালনা উপকমিটির আহ্বায়ক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী।
এবারের নির্বাচনে ১৪টি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৪০ জন প্রার্থী। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলীয় জোট পৃথক প্যানেলে প্রার্থী দেয়। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি পদে আলাদা প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। মোট ১১ হাজার ৯৭ ভোটারের মধ্যে ভোট দেন ৪ হাজার ৪৮ জন। সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মোহাম্মদ আলী ২ হাজার ৫৮২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের এ কে এম রেজাউল করিম খন্দকার পান ৭৮৬ ভোট।
সহসভাপতি পদে মো. মাগফুর রহমান শেখ ও মো. শাহজাহান, কোষাধ্যক্ষ পদে মো. জিয়াউর রহমান এবং সহসম্পাদক পদে মাকসুদ উল্লাহ ও মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম মুকুল জয়ী হন নীল প্যানেল থেকে।
সাতটি সদস্য পদের মধ্যে ছয়টিতে জয় পায় নীল প্যানেল। বিজয়ীরা হলেন এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী, এ কে এম আজাদ হোসেন, ওয়াহিদ আফরোজ চৌধুরী, মো. কবির হোসেন, মো. জিয়া উদ্দিন মিয়া ও মো. টিপু সুলতান। অন্যদিকে সবুজ প্যানেলের আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী একটি সদস্য পদে জয়ী হন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় দুই বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এবার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত আইনজীবীরা মনোনয়ন জমা দিলেও যাচাই-বাছাইয়ে তা বাতিল হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের লিখিত আবেদন এবং সাধারণ আইনজীবীদের আপত্তির কারণে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
আইনজীবীরা জানান, অতীতে প্যানেলভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও আইনজীবীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ছিল। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্রচারণা চললেও বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটত না। তবে পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে পরিস্থিতি বদলে যায়।
২০২৩ সালের নির্বাচনে ভোট গ্রহণে বাধা ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পুলিশ ডেকে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলেও অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরাও হামলার শিকার হন। পরে একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেল পূর্ণ বিজয় লাভ করে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৪টি পদের মধ্যে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা চারটি পদে জয় পান। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেল অধিকাংশ পদে জয়ী হয়। তবে ওই নির্বাচনে জাল ভোট ও কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানানো হয়।
এরপর জুলাই–আগস্টের অভ্যুত্থানের পর সমিতির কার্যক্রম পরিচালনায় ১৪ সদস্যের অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট সাধারণ সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সভাপতি এবং রুহুল কুদ্দুস কাজল সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে দায়িত্ব পরিবর্তনের কারণে মাহফুজুর রহমান মিলন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান।
কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৫ সালের মার্চে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। পরবর্তীতে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মেয়াদের বিধান অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা করা হয়। সেই অনুযায়ী ১১ ও ১২ মার্চ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। তবে একাধিক আবেদনের পর বিশেষ সভায় তারিখ পরিবর্তন করা হয়।

