আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠনের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। প্রসিকিউশনের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে তিনজন নতুন প্রসিকিউটর নিয়োগ দিয়েছে সরকার। শিগগিরই আরও নিয়োগ দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে প্রসিকিউশন টিম থেকে কয়েকজনকে বাদ দেওয়া হতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তদন্ত সংস্থাতেও রদবদলের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিতর্ক এড়াতে এসব পরিবর্তন ধাপে ধাপে করা হবে।
মামলা বাড়ায় জনবল সংকট:
ট্রাইব্যুনালে মামলা ও আসামির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় তৃতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠনের আলোচনা থাকলেও আপাতত সে পথে যাচ্ছে না সরকার। বরং প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থায় জনবল বাড়িয়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ট্রাইব্যুনালে বেঞ্চ অফিসার, সহকারী বেঞ্চ অফিসার, প্রোগ্রামার, ডেসপাস সহকারী ও অফিস সহায়কসহ একাধিক পদে জনবল সংকট রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মাহমুদুল হাসান।
তিনি জানান, ট্রাইব্যুনাল–১-এর একজন বিচারকের জন্য বেঞ্চ অফিসার ও সহকারী বেঞ্চ অফিসার নেই। ট্রাইব্যুনাল–২-এর জন্য মোট ৯ জন বেঞ্চ অফিসার প্রয়োজন। পাশাপাশি অন্যান্য সহায়ক পদেও জনবল দরকার।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, মামলার চাপ বিবেচনায় প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন করা হবে। তবে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে এখনই কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি কোনো প্রশ্ন ওঠার মতো পরিস্থিতি নেই বলে তিনি মনে করেন।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কিছু প্রসিকিউটরের মধ্যে দায়িত্ব পালনে শিথিলতা দেখা গেছে। মামলা পরিচালনায় আগের মতো সক্রিয়তা নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের ধারণা, বিচার কার্যক্রমে সরকারের আন্তরিকতা কমে গেছে। তদন্ত সংস্থার কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছে প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষ।
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য:
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, মামলার সংখ্যা বাড়ায় সীমিত জনবল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। তবে বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি জানান, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থায় রদবদল সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই হয়ে থাকে। কাউকে যুক্ত করা বা বাদ দেওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি আরও বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে কোনো আপস করা হবে না এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, টিমের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি কাজ করছে। একজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে মামলার আসামিকে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে অর্থ দাবি করার প্রমাণ পাওয়ার তথ্যও রয়েছে। এছাড়া আরেক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও প্রকাশ্যে এসেছে। এসব ঘটনায় প্রসিকিউশন টিম বিব্রত অবস্থায় রয়েছে। নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নৈতিকতার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
ট্রাইব্যুনাল সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে ২২টিরও বেশি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আরও প্রায় ৪১টি মামলা অভিযোগ গঠন ও তদন্ত পর্যায়ে আছে। এসব মামলা মূলত আওয়ামী লীগ আমলের গুম-খুন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন নৃশংসতার অভিযোগে করা হয়েছে। এ পর্যন্ত চারটি মামলার রায়ে ৫৫ জন দণ্ডিত হয়েছেন। আরও অন্তত চারটি মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ২২টি মামলার মধ্যে একটি রায়ের অপেক্ষায় আছে এবং তিনটি মামলার কার্যক্রম শিগগির শেষ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে জানা গেছে।

