দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোতে নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। ফলে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করার সরকারি প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। বিচারিক প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বিশেষ বেঞ্চ গঠনের পক্ষে মত দিচ্ছেন, আবার কেউ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মুন্সিগঞ্জ ও রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার দুটি আলোচিত ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, নিম্ন আদালতে দ্রুত রায় হলেও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপ পেরোতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
আইনজীবী ও বিচার বিশ্লেষকদের মতে, বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণাই কোনো মামলার শেষ ধাপ নয়। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলোতে হাইকোর্টের অনুমোদন, আপিল, রিভিউ এবং সাংবিধানিক বিভিন্ন আইনি সুযোগ থাকায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত বহু বছর সময় লেগে যেতে পারে।
এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে আলোচিত কয়েকটি মামলার কথা সামনে এসেছে। মাগুরার এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় বিচারিক আদালত মাত্র ১৩ কার্যদিবসের মধ্যে রায় দিলেও এক বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পরও উচ্চ আদালতে মামলার শুনানি কার্যত শুরু হয়নি। একইভাবে ফেনীর মাদরাসাছাত্রী হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
শুধু তাই নয়, সিলেটের কিশোর রাজন হত্যা এবং খুলনার শিশু রাকিব হত্যা মামলাও দ্রুত বিচারের নজির হিসেবে আলোচিত হয়েছিল। বিচারিক আদালত ও পরে হাইকোর্টে রায় হলেও প্রায় এক দশক পরও মামলাগুলো আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এ অবস্থায় আইনজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলার জন্য উচ্চ আদালতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার নিয়ে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি।
অন্যদিকে আরেকটি মত হচ্ছে, শুধুমাত্র আলোচিত মামলার জন্য আলাদা বেঞ্চ গঠন করলে অন্য মামলাগুলো আরও পিছিয়ে পড়তে পারে। তাই জনআকাঙ্ক্ষিত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির ব্যবস্থা করতে একটি বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেল মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং দ্রুত শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে।
বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, একটি হত্যা বা ধর্ষণ মামলা তদন্ত থেকে শুরু করে চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত বহু ধাপ অতিক্রম করে। অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক এবং রায়ের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন। চার্জ গঠনের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন, হাইকোর্টে আপিল, আপিল বিভাগের শুনানি—সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলোতে ডেথ রেফারেন্স বাধ্যতামূলক হওয়ায় হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এরপর আপিল বিভাগে শুনানি এবং রায়ের পরও রিভিউ আবেদনের সুযোগ থাকে। সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সাংবিধানিক অধিকারও বিদ্যমান। ফলে বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও চূড়ান্তভাবে শাস্তি কার্যকর করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার বিলম্বের জন্য শুধু আইনি প্রক্রিয়াকে দায়ী করলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। উচ্চ আদালতে মামলা জট, পর্যাপ্ত বেঞ্চের অভাব, বিচারক সংকট, পেপারবুক প্রস্তুতে দীর্ঘ সময় এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাও বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তাদের ভাষ্য, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে শুধু দ্রুত রায় ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; বরং মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ বিচার বিলম্বিত হলে অনেক ক্ষেত্রে তা বিচার না পাওয়ার সমতুল্য হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত এবং কার্যকর বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের জন্য শক্ত বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই উচ্চ আদালতে এসব মামলার নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করতে বিশেষ বেঞ্চ, বিশেষ সেল অথবা বিচারিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো যে কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
তবে একটি বিষয়ে প্রায় সব আইনজ্ঞই একমত—শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো নৃশংস অপরাধের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমবে, অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় হ্রাস পাবে এবং সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

