গুমের অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন আইনের খসড়ায়। আইন মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এর খসড়ায় এমন বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজ্ঞরা। তাঁদের মতে, যেসব বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ ওঠে, সেই বাহিনীর মাধ্যমেই তদন্ত পরিচালিত হলে নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুমের বহু অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগকারীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ জারি করেছিল। বর্তমানে গুমের ঘটনায় র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে।
পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিল আকারে অনুমোদনের জন্য তা উপস্থাপন না হওয়ায় অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যায়। পরে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় মত দেওয়া হয়, আগের অধ্যাদেশকে আইন হিসেবে পাস না করে সংশোধিত আকারে নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বর্তমান খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
নতুন খসড়ার ১৪(১) ধারায় গুমের অভিযোগ গ্রহণের ক্ষমতা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসিকে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। খসড়ার ১৯ ধারা অনুযায়ী, এসব মামলার বিচার হবে দায়রা জজ আদালতে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে গুম-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে দেওয়া হয়েছিল। ওই অধ্যাদেশের ৮(১) ধারা অনুযায়ী, ভুক্তভোগী বা ঘটনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা কোনো ব্যক্তি কমিশনের মনোনীত কর্মকর্তার কাছে সরাসরি, অনলাইনে কিংবা ডাকযোগে অভিযোগ করতে পারতেন। থানার ওসি বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করা হলেও তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমিশনে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা ছিল।
একই অধ্যাদেশের ৮(২) ধারায় তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ এবং ৮(৬) ধারায় তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদনের পর ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর বিধান ছিল। ফলে অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত করা হয়েছিল।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি মনজিল মোরসেদ মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপরই তদন্তের দায়িত্ব দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তাঁর ভাষ্য, অতীতে মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের ক্ষমতা দিয়ে যে অধ্যাদেশ করা হয়েছিল, সেটিই অধিকতর উপযুক্ত ছিল। বিশেষ করে ডিজিএফআই বা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুলিশ কতটা কার্যকরভাবে তদন্ত করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি মনে করেন, তদন্তের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাপনাও কমিশনের আওতায় থাকা উচিত।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেনও খসড়ার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, এসব বিধান মূলত প্রশাসন ও পুলিশের ক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশন বা অন্য কোনো স্বাধীন কমিশনের হাতে থাকা উচিত। তবে সেই কমিশনের সদস্যদেরও অবশ্যই সৎ ও নিরপেক্ষ হতে হবে।
আগের অধ্যাদেশে কমিশনকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ৭(ঘ) ধারা অনুযায়ী, কোনো অভিযোগ বা আদালতের আদেশ ছাড়াই কমিশন কারাগার, আটককেন্দ্র বা অন্য যেকোনো স্থাপনায় প্রবেশ ও পরিদর্শন করতে পারত। ৭(ঙ) ও ৭(চ) ধারায় গোপন আটককেন্দ্র শনাক্ত করার জন্য যেকোনো স্থাপনা পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ৭(ছ) ধারায় তদন্তের স্বার্থে যেকোনো ব্যক্তিকে তলব ও জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
কিন্তু নতুন খসড়ার ১৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার জন্য আদালত ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবেন। সমালোচকদের মতে, এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট স্থানের তথ্য প্রয়োজন হয়। অথচ অধিকাংশ গুমের ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা জানতেই পারেন না নিখোঁজ ব্যক্তি কোথায় বা কার হেফাজতে আছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আলোচনায় আসা ‘আয়নাঘর’-এর ঘটনাও সেই বাস্তবতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও নতুন খসড়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের ২৪ ধারা অনুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তির চিকিৎসা, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তার জন্য কমিশন তহবিল গঠন এবং সেই তহবিল থেকে ব্যয়ের ক্ষমতা পেত। তবে নতুন খসড়ার ৩০ ধারায় এই ক্ষমতা সরকারের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিসের মতে, খসড়ার ১৪ ধারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করার মতো ব্যবস্থা নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, পুলিশ কি বাস্তবে ডিজিএফআইয়ের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত পরিচালনা করতে পারবে? তাঁর মতে, আগের অধ্যাদেশের মতো তদন্তের দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনের কাছেই থাকা উচিত।

