রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের বিচারিক ইতিহাসে দ্রুততম নিষ্পত্তি হওয়া আলোচিত মামলাগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো এই মামলা।
রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে মামলার উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। সকালেই কারাগার থেকে দুই আসামিকে আদালতে আনা হয় এবং রায় ঘোষণার আগে তাদের আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় ঘটে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড। ওইদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় আট বছর বয়সী রামিসা। কিছু সময় পর পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলে পাশের একটি বাসার সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তারা শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত সর্বত্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিশুটির জন্য দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে।
মামলার তদন্তে দ্রুত অগ্রগতি আনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনার পরপরই প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা মাত্র চার দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। মামলায় মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়।
এরপর দ্রুতগতিতে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়। জুনের শুরুতে দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। পরদিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করে আদালত। অল্প সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, জেরা এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পরে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হওয়ার পর রায়ের দিন ধার্য করা হয়।
আইনজীবীদের মতে, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ঘটনার পরপরই আসামিদের গ্রেপ্তার, আলামত সংগ্রহে দ্রুততা, তদন্ত প্রতিবেদনের দ্রুত দাখিল এবং সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ায় বিচারিক প্রক্রিয়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বিচারিক আদালতের রায়ই মামলার শেষ ধাপ নয়। মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানিসহ আরও কয়েকটি আইনগত ধাপ রয়েছে। ফলে চূড়ান্তভাবে শাস্তি কার্যকর হতে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার একাধিক আলোচিত মামলায় বিচারিক আদালত দ্রুত রায় দিলেও উচ্চ আদালতে দীর্ঘ সময় ধরে মামলাগুলো বিচারাধীন থাকার নজির রয়েছে। সে কারণে অনেকেই এখন এই মামলার দ্রুত চূড়ান্ত নিষ্পত্তির বিষয়েও নজর রাখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রামিসা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও শক্তিশালী করতে হলে শুধু নিম্ন আদালতে নয়, উচ্চ আদালতেও সংবেদনশীল ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর বিচার যেমন অপরাধীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা তৈরি করে, তেমনি ভুক্তভোগী পরিবার এবং সমাজের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসও জোরদার করে। তাই এই ধরনের মামলার প্রতিটি ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

