দেশজুড়ে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের বহু আলোচিত মামলায় বিচার পেতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্যগ্রহণে জটিলতা, এবং উচ্চ আদালতে শুনানির বিলম্ব—সব মিলিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কার্যত এক ধরনের ‘আইনি অচলাবস্থায়’ আটকে আছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার পর ৪৪টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে। তবে এসব মামলার অধিকাংশেই দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
ঝুলে আছে ১.৫ লাখের বেশি মামলা:
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশের আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট বিভাগ এবং বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে প্রায় ৪১ হাজার মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। অর্থাৎ মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ২৪ শতাংশ দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১০১টি আদালত রয়েছে। প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি করে মামলা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলার তুলনায় আদালতের সংখ্যা এখনো অপ্রতুল।
রূপা হত্যা মামলা: প্রায় ৯ বছরেও শেষ হয়নি বিচার:
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে কলেজছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ছয় মাসের কম সময়ের মধ্যে ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আদালত বাসচালক ও তিন হেল্পারকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সুপারভাইজারকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
তবে প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও মামলাটি এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে পৌঁছায়নি। গত বছর ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং সুপারভাইজারের সাজা বহাল রাখেন। এরপর আসামিরা আপিল বিভাগে আবেদন করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী জানান, এখনো আপিলের শুনানি শুরু হয়নি।
এদিকে রূপার পরিবার হতাশায় ভুগছে। তার বড় ভাই জানান, তারা হাইকোর্টের রায়ে সন্তুষ্ট নন। পাশাপাশি বাসটি ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আদেশ থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
শিশু আসিয়া ও টনু মামলা: বছরের পর বছর অচলাবস্থা:
মাগুরার আট বছরের শিশু আসিয়ার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গত ১৭ মে ২০২৫ তারিখে এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং দুইজনকে খালাস দেওয়া হয়। তবে হাইকোর্টে আপিল ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার শুনানি এখনো ঝুলে আছে।
আসিয়ার মা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, দীর্ঘসূত্রতা শেষ পর্যন্ত আসামিদেরই সুবিধা দিতে পারে। অন্যদিকে ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে সংঘটিত সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ ও হত্যার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি—এক দশকের বেশি সময় পরেও।
কোথায় আটকে যাচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রায় প্রতিটি ধাপেই বিলম্ব হচ্ছে।
- মেডিকেল রিপোর্ট ও ডিএনএ পরীক্ষার ফল পেতে দেরি
- চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব
- সাক্ষী হাজির না হওয়া
- শুনানির তারিখ দীর্ঘ ব্যবধানে নির্ধারণ
- চিকিৎসক ও তদন্ত কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য গ্রহণে জটিলতা
অনেক সময় সাক্ষীরা ভয়, সামাজিক চাপ বা অনীহায় আদালতে আসেন না। এতে মামলা বছরের পর বছর আটকে থাকে। আর্থিক সংকটের কারণে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার একসময় মামলা চালানোই বন্ধ করে দেয়।
আইনে তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও আপিল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফলে রায় হওয়ার পরও ভুক্তভোগীদের আরও দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয়। বর্তমানে আপিল বিভাগে প্রায় ১ হাজার এবং হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় ৮ হাজার আপিল বিচারাধীন রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলার চাপ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের তদারকি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। একজন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ বলেন, মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিচারকরা দ্রুত নিষ্পত্তিতে সময় দিতে পারছেন না। এছাড়া অনেক মিথ্যা মামলা দায়ের হওয়ায়ও জট বাড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আইন অনুযায়ী দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হচ্ছে না। বছরের পর বছর অপেক্ষা, আদালতের ধীরগতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার এখনো অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

