শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে যে ঘটনাগুলো গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে, সেগুলোর বিচার তুলনামূলকভাবে দ্রুত সম্পন্ন হয়। কিন্তু একই ধরনের অনেক মামলা আলোচনার বাইরে থাকায় সেগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে নানা পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আলোচনার মাত্রার ওপর নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। গতকাল রবিবার (৭ জুন) আলোচিত শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আদালত অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড দেন। দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়াকে অনেকে নজির হিসেবে দেখছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রতিটি ঘটনা ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য সমান কষ্টের। তাই সব মামলার বিচারই দ্রুত হওয়া উচিত। প্রশ্ন উঠছে, আলোচনায় না এলে একই ধরনের অপরাধ কি একই গুরুত্ব পাচ্ছে?
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার অভিযোগপত্র এক মাসের মধ্যে জমা দেওয়া হয়। অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ২৪ দিনের মাথায় আদালত রায় ঘোষণা করে। অন্যদিকে, গত ২১ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আরও সাম্প্রতিক ঘটনায়, গত ১৯ মে পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের পর মাত্র পাঁচ কর্মদিবসে শুনানি শেষ হয়। ষষ্ঠ কর্মদিবসে রায় ঘোষণা করা হয়।
আলোচিত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি প্রশংসনীয় হলেও একই ধরনের বহু মামলা অগোচরে রয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। তারা বলছেন, ব্যক্তি, স্থান বা প্রচারের মাত্রা নয়—অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা উচিত।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ২ হাজার ৫৮১ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। বছরভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী— ২০২৫ সালে ৪১০ শিশু, ২০২৪ সালে ৫৭৪ শিশু, ২০২৩ সালে ৪৮৫ শিশু, ২০২২ সালে ৫১৬ শিশু এবং ২০২১ সালে ৫৯৬ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্তত ১২০ শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ দক্ষ জনবলের অভাব। তিনি বলেন, “মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হচ্ছে দক্ষ জনবলের অভাব। লাখ লাখ মামলার মধ্যে কয়টা আর গণমাধ্যমে আসে। জনবহুল এই দেশে বিচারক আছেন মাত্র ১৮০০ থেকে ১৯০০ জন। বিচার বিভাগের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ হয় এক শতাংশেরও কম। তা ছাড়া মামলা নিষ্পত্তি করা তো শুধু আদালতের বিষয় না। মামলার তদন্ত করে পুলিশ। এসব সমস্যা সেখানেও আছে।”
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আলোচিত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও অনেক অসহায় মানুষের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আইনের শাসনের এটি একটি দুর্বলতা। যেই মামলার বিষয়ে গণমাধ্যমে খুব হইচই পড়ে যায়, দেশের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন, তখন সেটি ফার্স্ট ট্র্যাকে কয়েক দিনের মধ্যে বিচার হয়ে যায়। আর এমন অনেক অসহায় বা অন উল্লেখ্য লোক আছেন, যাদের তেমন কোনো লোকজন নেই, তখন গণমাধ্যমে তেমন হইচই পড়ে না, প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন না—তাদের মামলার নিষ্পত্তি কবে হবে কেউ বলতে পারেন না। এটা এক ধরনের বৈষম্য। বিচারব্যবস্থায় এমন বৈষম্য থাকলে একে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা বলে না।” তিনি আরও বলেন, সব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান। তাই প্রতিটি ভুক্তভোগী সমান গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে। তিনি বলেন, “যেকোনো আলোচিত ঘটনার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চল বা কম আলোচিত এলাকায় সংঘটিত শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত ও বিচার করতে হবে।”
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, গণমাধ্যমের প্রভাব অনেক সময় বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়। তিনি বলেন, “বর্তমান সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের এক ধরনের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, যা শিশুহত্যার মতো ঘটনার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিককে সমানভাবে দেখা।” তিনি আরও বলেন, বিচার ব্যবস্থায় সমতা না থাকলে নাগরিকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, শিশুহত্যা মামলার তদন্তে কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “শিশুহত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের মামলায় পুলিশ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে থাকে। তবে সব মামলায় সমানভাবে চার্জশিট জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সময় নির্ধারণ করা যায় না। অনেক সময় সাক্ষ্য, প্রমাণ, আলামতের রিপোর্টসহ নানা কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়ে থাকে।” তিনি আরও জানান, এসব স্পর্শকাতর মামলায় নিয়মিত তদারকি করা হয়।
দ্রুত বিচার পাওয়া আলোচিত মামলাগুলো যেমন স্বস্তি দিচ্ছে, তেমনি অগোচরে থাকা অসংখ্য মামলার ধীরগতিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ন্যায়বিচারের প্রকৃত মানদণ্ড হতে পারে না আলোচনার মাত্রা। বরং প্রতিটি ভুক্তভোগীর জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব।

