কষ্টের জমানো অর্থে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করলেন। কিনলেন এক টুকরো জমি। দলিল সম্পন্ন হলো। নামজারিও শেষ। মনে হলো, এবার নিশ্চিন্ত।
কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই হঠাৎ নেমে এলো অপ্রত্যাশিত ধাক্কা। আদালত থেকে এল সমন। জানা গেল, আপনার কেনা জমির ওপরই উঠেছে অগ্রক্রয় মামলা। দাবি করছেন প্রতিবেশী বা ওই জমির কোনো অংশীদার। মুহূর্তেই ঝুলে গেল স্বপ্নের জমির ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে প্রবাসী কিংবা অবসরকালীন সঞ্চয়ে জমি কেনা মানুষের জন্য এ ঝুঁকি আরও বেশি। সামান্য অসচেতনতা বড় ধরনের আইনি জটিলতায় ফেলে দিতে পারে।
কীভাবে তৈরি হয় এমন জটিলতা:
ধরা যাক, আপনি ‘রহিম’ নামের একজনের কাছ থেকে জমি কিনলেন। কিন্তু পরে জানা গেল, ওই জমির একাধিক শরিক বা অংশীদার ছিল। তাদের কাউকেই আপনি জানতেন না বা জানানো হয়নি।
জমি কেনার পরপরই ওই শরিকরা আদালতে মামলা করেন। তাঁদের দাবি, জমিটি তাঁদের কাছেই বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁদের না জানিয়ে বাইরের একজনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী আদালত অনেক ক্ষেত্রে ওই শরিকদের পক্ষেই রায় দিতে পারে। ফলে ক্রেতা পড়েন চরম অনিশ্চয়তায়।
আইন কী বলে?
বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ১৮৮৫, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা এবং ১৯৪৯ সালের অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইনের ২৪ ধারায় অগ্রক্রয় বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। যখন কোনো জমি শরিক বা অংশীদারদের বাদ দিয়ে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়, তখন নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি অগ্রক্রয় মামলা করতে পারেন। সাধারণত এই অধিকার ছিল তিন শ্রেণির ব্যক্তির—
১. বিক্রেতার জমির ওয়ারিশ সূত্রে শরিক
২. বিক্রেতার জমির ক্রয় সূত্রে শরিক
৩. পার্শ্ববর্তী বা সংলগ্ন জমির মালিক
তবে ২০০৬ সালের সংশোধনের পর সংলগ্ন জমির মালিকরা এই অধিকার আর পান না। এখন কেবল ওয়ারিশ ও ক্রয় সূত্রের শরিকদের অধিকার বহাল আছে।
অগ্রক্রয় মামলা থেকে বাঁচার ৬টি কার্যকর উপায়: জমি কেনার আগে এবং পরে কিছু সতর্কতা নিলে এ ধরনের জটিলতা অনেকটাই এড়ানো যায়।
১. আইনি নোটিশ পাঠানো: জমি কেনার আগে ওই দাগের সব সম্ভাব্য শরিকদের রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ দিন। জানান, আপনি জমিটি কিনতে যাচ্ছেন।
২. দলিলে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ: অনেকেই দলিলে কম মূল্য দেখান খরচ বাঁচাতে। এটি বড় ভুল। এতে মামলার ক্ষেত্রে কম টাকাই আদালতে জমা দিয়ে জমি দাবি করা সহজ হয়ে যায়। তাই প্রকৃত বাজারমূল্য উল্লেখ করা জরুরি।
৩. সম্ভাব্য শরিকদের সাক্ষী রাখা: এজমালি বা শরিকানা সম্পত্তির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অগ্রক্রয়কারীদের দলিলে সাক্ষী বা শনাক্তকারী হিসেবে রাখা হলে পরে তাদের মামলা করার সুযোগ কমে যায়।
৪. প্রকাশ্য নোটিশ ও বিজ্ঞপ্তি: জমির ওপর নোটিশ টাঙিয়ে বা আইনজীবীর মাধ্যমে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো যায় যে, জমিটি কেনা হচ্ছে। এতে শরিকদের আগেই জানা থাকে।
৫. বিক্রেতার কাছে ফেরত দেওয়া: যদি অগ্রক্রয় মামলার ঝুঁকি বেশি থাকে, তাহলে জমিটি দলিলের মাধ্যমে বিক্রেতার কাছেই ফেরত দিলে পরে আর কেউ অগ্রক্রয়ের দাবি তুলতে পারে না।
৬. তাৎক্ষণিক দাবি করার নিয়ম: মুসলিম আইনে অগ্রক্রয়ের ক্ষেত্রে খবর জানার সঙ্গে সঙ্গেই সাক্ষীদের সামনে তাৎক্ষণিক দাবি করতে হয়। এই প্রক্রিয়াগত নিয়ম সঠিকভাবে না মানলে মামলার ভিত্তি দুর্বল হতে পারে।
জমি কেনা শুধু একটি বিনিয়োগ নয়, অনেকের জীবনের বড় স্বপ্ন। তাই সামান্য অসতর্কতা যেন বড় কোনো আইনি ঝামেলায় সেই স্বপ্ন ভেঙে না দেয়, সে বিষয়ে শুরু থেকেই সচেতন থাকা জরুরি।
- লেখক: অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।

