প্রস্তাবিত ‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’কে শুধু একটি সাধারণ অপরাধ দমন আইন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খসড়াটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এটি জুয়া প্রতিরোধের চেয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিসর বাড়ানোর দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। বিশেষ করে ডিজিটাল নজরদারি, তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে এটি নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
সরকার একে জুয়াবিরোধী আইন হিসেবে উপস্থাপন করলেও খসড়ার ভেতরে নজরদারি, তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনার এমন সব ক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে, যা নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সত্যিই জুয়া দমন, নাকি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার উদ্যোগ?
অনলাইন জুয়া ইতোমধ্যেই বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য। তাই নতুন করে আলাদা আইন আনার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের মতে, এখানে জুয়া মূল লক্ষ্য নয়; বরং আইনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্প্রসারণই উদ্দেশ্য।
খসড়ার ৪৩ ধারায় প্রস্তাবিত ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ ধারণা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই ব্যবস্থায় কোনো বিচারিক আদেশ ছাড়াই একজন নাগরিককে ডিজিটাল ও আর্থিকভাবে কার্যত অচল করে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র, সিম, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা, ডিভাইস ও ইন্টারনেট পরিচয়—সবকিছু একটি কেন্দ্রীয় তালিকায় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে কিন্তু ভুল হলে প্রতিকার কী হবে, বা নাগরিক কীভাবে আপিল করবেন—এ বিষয়ে স্পষ্টতা নেই।
৪৪ ও ৪৭ ধারায় এনআইডি, সিম, ব্যাংকিং তথ্য, বায়োমেট্রিক পরিচয় ও মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি একত্র করার ক্ষমতা রাষ্ট্রকে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গভীর প্যাকেট পরিদর্শন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর পর্যবেক্ষণের কথাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নজরদারি কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যেখানে নাগরিকের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের বিস্তৃত সুযোগ থাকবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও একসময় জননিরাপত্তার যুক্তিতে শুরু হয়েছিল। পরে এটি সাংবাদিক, লেখক, কার্টুনিস্ট, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণির নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগে বিতর্কিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে একই ধরনের ক্ষমতা নতুন নামে ফিরে এলে তা নীতিগত অগ্রগতি না হয়ে বরং পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা হতে পারে বলে সমালোচনা রয়েছে।
খসড়ার ৩৯ ধারায় ওয়ারেন্ট ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা, ৩৭ ধারায় অনেক অপরাধকে অজামিনযোগ্য করা এবং ৩৬ ধারায় মোবাইল আদালতের মাধ্যমে বিচার পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে। এগুলো নাগরিক স্বাধীনতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দিচ্ছেন সমালোচকরা। তাদের মতে, সন্দেহের ভিত্তিতে দীর্ঘ সময় আটক রাখার সুযোগ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে মানানসই নয়।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনকে কার্যত দুর্বল করে দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। একদিকে তথ্য সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে একই তথ্য ব্যবহারের বিস্তৃত ক্ষমতা—এই দ্বৈত অবস্থানকে নীতিগত বিরোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খসড়ায় বাস্তব ডিজিটাল ব্যবহারের জটিলতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলেও সমালোচনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর ইচ্ছা ছাড়াই ওয়েবসাইটে জুয়ার বিজ্ঞাপন বা পপ-আপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়। এ অবস্থায় কোনো প্রবেশ ইচ্ছাকৃত ছিল নাকি স্বয়ংক্রিয় বিজ্ঞাপনের কারণে হয়েছে—তা নির্ধারণের স্পষ্ট মানদণ্ড খসড়ায় নেই। ফলে তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অতীতে বিভিন্ন অভিযোগে নাগরিকের মোবাইল ফোন বা ব্যক্তিগত তথ্য অনানুষ্ঠানিকভাবে তল্লাশির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এসব অভিজ্ঞতার কারণে নতুন করে বিপুল ডিজিটাল ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে গেলে অপব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সমালোচকদের মতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলেই তা প্রয়োগের সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া যায় না। বরং কঠোর বিচারিক তদারকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
খসড়া আইনের সমালোচকদের মতে, এখানে মূল সমস্যা হলো আস্থার ঘাটতি। রাষ্ট্র নাগরিককে সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে দেখছে—এই ধারণাই পুরো কাঠামোর ভিত্তি হয়ে উঠেছে। অনলাইন জুয়া একটি বাস্তব সামাজিক সমস্যা হলেও তার সমাধান যদি আরও বড় মাত্রার নজরদারি ও স্বাধীনতা সংকোচনের দিকে যায়, তবে তা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
সব দিক বিবেচনায় খসড়া আইনটি নিয়ে জনপরামর্শ ও পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠছে। সমালোচকদের মতে, এটি অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা না করা হলে ভবিষ্যতে এটি শুধু জুয়া প্রতিরোধ আইন হিসেবে নয়, বরং ডিজিটাল স্বাধীনতা সংকোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে আলোচিত হতে পারে।

