দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিরপুরে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। এ ঘটনার বিচার দাবিতে চলছে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি। ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্রুত ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে অতীতের বহু আলোচিত মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে—দ্রুত বিচার কি সত্যিই সম্ভব?
দেশে আলোচিত অনেক হত্যা ও নারী নির্যাতনের মামলায় বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় এলেও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপে বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে চূড়ান্ত বিচার এবং সাজা কার্যকরের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার মামলাটি এর অন্যতম উদাহরণ।
সাত বছর ধরে উচ্চ আদালতে অপেক্ষা:
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহে যাচ্ছিলেন এক তরুণী। পথে চলন্ত বাসে তাকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। পরে হত্যা করে তার মরদেহ মধুপুর বন এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়।
দেশজুড়ে আলোচিত এ মামলায় বিচারিক আদালত মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে রায় দেন। ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত রায়ে বাসচালক হাবিবুর, চালকের সহকারী শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বাসের সুপারভাইজার সফর আলীকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলাটি উচ্চ আদালতে পৌঁছায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হওয়ায় ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের করা আপিল একসঙ্গে শুনানি হয়। দীর্ঘ সাত বছর পর এসব বিষয়ে শুনানি শেষ করে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি রায় দেন হাইকোর্ট।
সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মাসুদ রানা ২৪ মে যুগান্তরকে জানান, বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির মধ্যে তিনজনের সাজা কমিয়ে দিয়েছেন হাইকোর্ট। এর মধ্যে শামীম ও জাহাঙ্গীরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
অন্যদিকে বাসচালক হাবিব মিয়ার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারিক আদালতে সফর আলীর বিরুদ্ধে দেওয়া সাত বছরের সাজা বহাল রাখা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর আসামি আকরাম এরই মধ্যে মারা গেছেন।
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করেছে। তবে এখনো সেই আপিলের শুনানি শুরু হয়নি। ফলে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।
শুধু টাঙ্গাইলের ঘটনাই নয়, দেশের আরও কয়েকটি বহুল আলোচিত মামলাও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে আটকে আছে। এর মধ্যে রয়েছে চাঁদপুরের আলোচিত পারভীন হত্যা মামলা, নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা, বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলা এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা।
চাঁদপুরের পারভীন হত্যা মামলায় অভিযুক্ত রসু খাঁকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। একই মামলার অপর দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৮ সালের ৬ মার্চ বিচারিক আদালত রসু খাঁ, জহিরুল ও ইউনুছ—এই তিন আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। বর্তমানে রসু খাঁ ও জহিরুল কারাগারে থাকলেও ইউনুছ পলাতক। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখনো তাদের সাজা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
সুপ্রিমকোর্টের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক গত ২৫ মে বলেন, রসু খাঁর মামলার শুনানি শিগগিরই আপিল বিভাগে হতে পারে। একই সঙ্গে টাঙ্গাইলের চলন্ত বাসে তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে শুনানির উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘসূত্রতায় ভোগা এসব চাঞ্চল্যকর মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিমকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের দাবি জানিয়েছেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
২৪ মে তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়া চলতে থাকলে মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। নারী ও শিশু নির্যাতনসহ আলোচিত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, উচ্চ আদালতে বিচারকসংখ্যা বাড়ানো এবং মামলার জট কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কাটানো কঠিন হবে।
রামিসা হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচারের দাবি এখন জনমতের কেন্দ্রে কিন্তু অতীতের বহু আলোচিত মামলার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বিচারিক আদালতের রায় দ্রুত এলেও উচ্চ আদালতের ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—আলোচিত ঘটনার সময় দেওয়া দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবে রূপ নেয়।

