মানুষের জীবন রক্ষায় চিকিৎসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত কথা রয়েছে—ডাক্তারকে আল্লাহর পরেই মানুষের দ্বিতীয় জীবনদাতা বলা হয়। কারণ রোগীর সুস্থতা ও জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব অনেকাংশেই তাদের কাঁধে থাকে। তবে যখন কোনো চিকিৎসকের অবহেলা, ভুল সিদ্ধান্ত, অনৈতিক আচরণ বা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে রোগীর শারীরিক ক্ষতি হয় কিংবা মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তখন বিষয়টি শুধু নৈতিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আইনি প্রশ্নেও পরিণত হয়।
এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা তার পরিবারের সদস্যরা কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন, সেটি জানা জরুরি। চিকিৎসকের কোন কোন কর্মকাণ্ড আইন অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে, অভিযোগ দায়েরের জন্য কোন আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে কী ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে এবং আদালতে অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য কী ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে আজকের এই নিবন্ধে।
চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রোগীর অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই চিকিৎসা অবহেলা বা প্রতারণার অভিযোগ সামনে এলে আইন কী ধরনের সুরক্ষা দেয় এবং প্রতিকার পাওয়ার পথ কী, তা জানা প্রত্যেক নাগরিকের জন্যই প্রয়োজনীয়।
চিকিৎসকের কোন কাজগুলো অবহেলা বা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে?
চিকিৎসা অবহেলা বলতে শুধু একজন চিকিৎসকের ভুল বা গাফিলতিকেই বোঝায় না। অনেক ক্ষেত্রে নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ কিংবা ওষুধ সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহেলাও এর আওতায় পড়তে পারে। রোগীর চিকিৎসা ও সেবাপ্রক্রিয়ায় জড়িত যেকোনো পক্ষের দায়িত্বহীন আচরণ ক্ষতির কারণ হলে তা আইনি তদন্তের বিষয় হতে পারে।
সাধারণভাবে যেসব কর্মকাণ্ড চিকিৎসা অবহেলা বা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে রোগীকে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা কিংবা প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ছাড়াই চিকিৎসা প্রদান করা। একইভাবে ভুল ওষুধ, ইনজেকশন বা চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগ এবং ভুল স্থানে বা ভুল রোগীর অস্ত্রোপচার করাও গুরুতর অবহেলার পর্যায়ে পড়ে।
অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর শরীরের ভেতরে গজ, ব্যান্ডেজ বা অন্য কোনো চিকিৎসা উপকরণ রেখে দেওয়াও চিকিৎসাগত গাফিলতির একটি পরিচিত উদাহরণ। এ ধরনের ভুল রোগীর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া রোগীর সঙ্গে অশোভন আচরণ, চিকিৎসা ফি নিয়ে অনৈতিক দরকষাকষি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারও প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কোনো চিকিৎসক যদি নিজের প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতার বাইরে ভুয়া বা জাল ডিগ্রির তথ্য ব্যবহার করে রোগীদের বিভ্রান্ত করেন, সেটিও প্রতারণার শামিল।
মেডিকেল প্রতিবেদন বা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল, বিভ্রান্তিকর বা মনগড়া তথ্য যুক্ত করাও গুরুতর অপরাধের মধ্যে পড়ে। পাশাপাশি হাসপাতালে সিট, চিকিৎসাসেবা বা প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বিলম্ব কিংবা রোগীকে বারবার হয়রানির শিকার করাও দায়িত্ব পালনে অবহেলা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
চিকিৎসা অবহেলার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে কী শাস্তির বিধান আছে?
বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনে চিকিৎসা অবহেলা, প্রতারণা কিংবা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী ফৌজদারি, দেওয়ানি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার আওতায় চিকিৎসক কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
দণ্ডবিধিতে শাস্তির বিধান:
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৪(ক) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির অবহেলা বা বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে অন্য কারও মৃত্যু ঘটলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া গর্ভপাত করানোর প্রক্রিয়ায় কোনো নারীর মৃত্যু ঘটলে দণ্ডবিধির ৩১৪ ধারার আওতায় সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও রয়েছে। দণ্ডবিধির ৯২ ধারা অনুযায়ী, কোনো চিকিৎসক যদি রোগীর কল্যাণের উদ্দেশ্যে সরল বিশ্বাসে চিকিৎসা প্রদান করেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ক্ষতি ঘটে, তাহলে সেটিকে সব ক্ষেত্রে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
ভোক্তা অধিকার আইনে প্রতিকার:
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী ব্যক্তি একজন ভোক্তা হিসেবে বিবেচিত হন। ফলে নির্ধারিত সেবার বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুল প্রতিবেদন প্রদান বা অবহেলাজনিত সেবা নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে দোষীর বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। একই সঙ্গে আদায় হওয়া জরিমানার একটি অংশ অভিযোগকারী ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেতে পারেন।
ক্ষতিপূরণের জন্য দেওয়ানি মামলা:
চিকিৎসা অবহেলার কারণে কেউ আর্থিক, শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির শিকার হলে তিনি বা তাঁর পরিবার দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করতে পারেন। দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ১৯ ধারা এ ধরনের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
বিএমডিসির প্রশাসনিক ব্যবস্থা:
চিকিৎসকদের পেশাগত মান ও নৈতিকতা তদারকির দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলা, অনিয়ম বা জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিএমডিসি তাঁর নিবন্ধন বা চিকিৎসা করার অনুমোদন বাতিল করতে পারে।
বেসরকারি চর্চা ও ক্লিনিক পরিচালনা সংক্রান্ত বিধান:
দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২-এ সরকারি চাকরিতে কর্মরত নিবন্ধিত চিকিৎসকদের জন্য কিছু সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, দাপ্তরিক সময়ে তারা বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা দিতে পারবেন না। একই সঙ্গে কোনো বেসরকারি ক্লিনিকের মালিকানা বা অংশীদারিত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে।
আইনের এসব বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে নির্ধারিত ফি ও অন্যান্য নিয়ম অমান্যের ঘটনাও আইনগত প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
আদালতে চিকিৎসা অবহেলা প্রমাণ করতে কী প্রয়োজন?
চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে কাউকে আইনের আওতায় আনতে হলে আদালতে কিছু মৌলিক বিষয় প্রমাণ করা অত্যন্ত জরুরি। শুধু অভিযোগ করলেই দায় প্রমাণ হয় না; বরং নির্দিষ্ট তিনটি উপাদান স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হয়।
প্রথমত, রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে যখন চিকিৎসা-সম্পর্ক বা চুক্তি তৈরি হয়, তখন চিকিৎসকের ওপর রোগীর প্রতি দায়িত্ব বা যত্ন নেওয়ার একটি আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। প্রমাণ করতে হয়—এই সম্পর্কটা সত্যিই ছিল কি না, যার কারণে চিকিৎসকের দায়িত্ব তৈরি হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টি প্রমাণ করা প্রয়োজন। এখানে দেখাতে হয় যে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী নির্ধারিত মান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেননি বা চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় গাফিলতি করেছেন।
তৃতীয়ত, ক্ষতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। অর্থাৎ চিকিৎসকের নির্দিষ্ট অবহেলা বা ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই রোগী শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কিংবা মৃত্যুবরণ করেছেন—এটি আদালতে প্রমাণ করতে হয়।
এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে প্রমাণ করা গেলে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং আদালত সে অনুযায়ী রায় দিতে পারে।
প্রতিকার পেতে কোথায় যেতে হবে?
চিকিৎসা অবহেলা বা প্রতারণার অভিযোগে ভুক্তভোগীরা পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন সংস্থার দ্বারস্থ হতে পারেন। সঠিক জায়গায় অভিযোগ দায়ের করলে দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করা যায় বাণিজ্যিক প্রতারণা, অতিরিক্ত ফি আদায় বা নিম্নমানের সেবা প্রদানের মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে। এ সংস্থা দ্রুত প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে।
অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু বা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়রা আদালতে মামলা করা যায়। দণ্ডবিধির আওতায় এসব মামলার বিচার সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে, চিকিৎসা অবহেলার কারণে আর্থিক ক্ষতি হলে বা বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হলে দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।
চিকিৎসকের পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা বা লাইসেন্স সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা যায়। প্রমাণিত হলে তারা চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে রিট বা জনস্বার্থ মামলা (পিআইএল) দায়েরের মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকর আইনি প্রতিকার চাওয়া সম্ভব হয়।
চিকিৎসা পেশা মানবসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। চিকিৎসকদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা দীর্ঘদিনের। তবে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা অনৈতিক আচরণের কারণে পুরো পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োজনে আইনি পথে প্রতিকার গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা বাড়লে শুধু ভুক্তভোগী নয়, পুরো স্বাস্থ্যসেবার মানও উন্নত হতে পারে।
- লেখক: অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও পিএইচ.ডি ইন ল।

