একটি দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন কতটা উন্নয়ন ও সুশাসনের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ সিঙ্গাপুর। একসময় মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত জেলেপল্লী হিসেবে পরিচিত এই ছোট্ট নগররাষ্ট্র আজ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্যের পেছনে আইনের শাসন এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সাতটি বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত তিনটি হলো সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে শুধু বিরোধী মহল নয়, তাদের অনেক শুভানুধ্যায়ীও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এই পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এবং বহু প্রতিশ্রুত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, এ সিদ্ধান্ত দেশের রাজনীতিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অতীতে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার ধারাবাহিকতারই আরেকটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পথ আরও কঠিন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিশ্রুতির দীর্ঘ ইতিহাস, বাস্তবায়নের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি:
বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো বিষয় নয়। স্বাধীনতার আগ থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে প্রকাশ্যে অঙ্গীকার করে এসেছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট ঘোষিত ঐতিহাসিক ২১ দফার অন্যতম অঙ্গীকার ছিল, ‘বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ হইতে পৃথক করা হইবে।’
এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করা হয়। একই লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। সেখানে বিচার বিভাগে কর্মরত ব্যক্তি এবং বিচারিক দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটিসহ নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর অর্পণের বিধান রাখা হয়েছিল।
তবে পরবর্তীকালে সংবিধানের চতুর্থ ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। সংশোধিত বিধানে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
এরপরও বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং এ-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা দূর করার প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক অঙ্গনে বারবার উচ্চারিত হয়েছে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের সময় প্রণীত তিন জোটের রূপরেখায় জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব প্রতিশ্রুতির অনেকটাই এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়েও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সুপ্রিম কোর্টের অধীন একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। বিএনপির বহুল আলোচিত ৩১ দফার ১০ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, সংবিধান ও মাজদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের হাতে অর্পণ, সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং এ লক্ষ্যে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
এ ছাড়া দলটির ঘোষিত পরিকল্পনায় আরও উল্লেখ রয়েছে, দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতিবোধ, বিচারবোধ ও সুনামের কঠোর মানদণ্ডে বিচারক নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি সংবিধানের ৯৫(২)(গ) অনুচ্ছেদের আলোকে সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদণ্ড নির্ধারণ করে ‘বিচারপতি নিয়োগ আইন’ প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে। এখন এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয় কি না, সেটিই দেখার অপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট মহল।
আদালতের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবায়নে রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা:
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় দেশের উচ্চ আদালতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৯৯ সালে দায়ের হওয়া বহুল আলোচিত মাজদার হোসেন মামলা। ওই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ১২টি নির্দেশনা দিয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।
এ বিষয়ে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ রায় আসে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ এবং অন্যান্য মামলায় আদালত সংবিধানের বর্তমান ১১৬ অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেন। একই সঙ্গে অষ্টম ও ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত মামলার রায়ের আলোকে ১৯৭২ সালের সংবিধানে যে রূপে ১১৬ অনুচ্ছেদ ছিল, তা পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে একটি স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় গঠনের নির্দেশও দেন আদালত। সংবিধান ও আইনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যার প্রশ্ন জড়িত থাকায় সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিলের জন্য আদালত সার্টিফিকেটও ইস্যু করেন।
রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা এবং আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট তিনটি অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশের আওতায় সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি রেফাত আহমেদ সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয়ের উদ্বোধন করেন।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন দেয়নি। এর মধ্যেই সরকার ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল নবগঠিত বিচার বিভাগের স্বাধীন সচিবালয় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন না দেওয়া এবং স্বাধীন সচিবালয়কে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আদালত অবমাননার শামিল। একই সঙ্গে এটি আইনের শাসনের নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক ব্যর্থতার প্রতিফলন আন্তর্জাতিক সূচকেও দেখা যায়। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট–এর তথ্য অনুযায়ী, আইনের শাসনের সূচকে বাংলাদেশের স্কোর সর্বোচ্চ ১-এর মধ্যে মাত্র ০.৩৯। বিশ্বের ১৪৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম। পাশাপাশি সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ২০টি দেশের তালিকাতেও রয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সূচকে দেশের অবস্থান চতুর্থ।
কেন প্রয়োজন স্বাধীন বিচার বিভাগ?
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর বাস্তব সুফল কী? বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সেই ক্ষমতা কেবল সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা যাবে। কিন্তু সংবিধান নিজে থেকে কার্যকর হয় না। সংবিধানের বিধান বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাংবিধানিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয়। সেই দায়িত্ব পালন করে বিচার বিভাগ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সাংবিধানিক চিন্তার বিকাশে ফরাসি দার্শনিক মন্টিস্কো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পৃথকীকরণের ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর চিন্তার ভিত্তিতেই নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা এবং বিচার বিভাগ—এই তিনটি সমমর্যাদার রাষ্ট্রীয় অঙ্গের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের সঙ্গে বিচার বিভাগ সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ফলে বিচারক নিয়োগে নিরপেক্ষতা এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা গণতন্ত্র ও সুশাসনের অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়েছে।
বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই এটিকে নির্বাহী ও আইনসভা থেকে কার্যকরভাবে পৃথক রাখতে হয়। পাশাপাশি বিচারকদের নিয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষভাবে এবং তাদের দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বাহ্যিক প্রভাব যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বেতন-ভাতা, তদারকি ও অপসারণসংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব ঊর্ধ্বতন বিচার বিভাগের হাতে থাকা প্রয়োজন।
যদি এসব কর্তৃত্ব নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ফলে অতীতের মতো বিচারক রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না, সে প্রশ্নও সামনে আসে। এ কারণেই ঊর্ধ্বতন বিচারকদের প্রশাসনিক দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনের জন্য সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি স্বাধীন সচিবালয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে।
স্বাধীন বিচার বিভাগ ও কার্যকর আইনের শাসনের সুফল বোঝার জন্য সিঙ্গাপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একসময় মশাবাহিত রোগপ্রবণ জেলেপল্লী হিসেবে পরিচিত এই নগররাষ্ট্র আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি ছিল শক্তিশালী আইনি কাঠামো এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা।
স্বাধীনতার পর থেকেই লি কুয়ান ইউয়ের নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। বিচার বিভাগকে স্বাধীন রাখা হয়, চুক্তি-সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয় যে, তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে এবং যেকোনো বিরোধ নিরপেক্ষভাবে আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। এই আস্থার পরিবেশই সিঙ্গাপুরকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আঞ্চলিক সদর দপ্তর স্থাপনের অন্যতম পছন্দের গন্তব্যে পরিণত করেছে।
আইনের শাসনের প্রভাব শুধু বিনিয়োগেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা কেপিআইবিকে শক্তিশালী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যেখানে মন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ সরকারি কর্মকর্তাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। এই জবাবদিহিতার সংস্কৃতি সরকারি সেবার মান উন্নত করেছে, ব্যবসার ব্যয় কমিয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়িয়েছে।
এ কারণেই বিশ্বব্যাংকের ‘সহজ ব্যবসার সুযোগ’ সূচকে সিঙ্গাপুর দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এর ভিত্তি হলো পূর্বানুমানযোগ্য, স্বচ্ছ এবং নিয়মভিত্তিক কার্যকর আইনি ব্যবস্থা। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের আইনের শাসন সূচকে সিঙ্গাপুরের স্কোর বর্তমানে ০.৭৮ এবং অবস্থান বিশ্বের ১৬তম। বিপরীতে বাংলাদেশের স্কোর ০.৩৯। অর্থাৎ সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শক্তিশালী আইনের শাসন, যা শুধু একটি আইনি কাঠামো নয়, বরং দেশটির উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশ এখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পথে নানা বাধা রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে এসব বাধার মধ্যে আত্মঘাতী রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, আইনের শাসনের ঘাটতি এবং সুশাসনের অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের মতে, এসব সীমাবদ্ধতা এখনও দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে শুধু রাজনীতিবিদ নয়, ব্যবসায়ী সমাজকেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি সচেতন নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক উদ্যোগ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার অবস্থান ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন কঠিন বলেই প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
- ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

