রাষ্ট্রের আর্থিক স্বাধীনতা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ভিত্তি গড়ে দেয়—এ ধারণা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তবে বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এ বিষয়ে নীতিগত বিতর্কের সুযোগ কম।
বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দ নিয়ে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়নকে বহু উন্নত কল্যাণরাষ্ট্র অনেক আগেই রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করেছে কিন্তু বাংলাদেশে এ উপলব্ধি এখনো সীমিত।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে একটি দেশের অবস্থান নির্ধারিত হয়—সেটি ভালো না খারাপ। এসব সূচনের মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাংকের বৈশ্বিক শাসন সূচক এবং ভালো শাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।
অন্যদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন উড়াল সেতু বা বড় প্রকল্প দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য হলেও সুশাসন তেমন নয়। এটি মূলত নাগরিক অভিজ্ঞতার বিষয়। সুশাসন এমন একটি কাঠামো, যা রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে। আর এ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো একটি স্বাধীন ও কার্যকর বিচার বিভাগ।
সংসদীয় ব্যবস্থায় বাজেটের বাস্তবতা:
প্রচলিত সংসদীয় গণতন্ত্রে বাজেট প্রণয়ন, পর্যালোচনা ও পাসের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপিত হয়। এরপর বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে তা অনুমোদন পায়।
তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিচার খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রায়ই সীমিত থাকে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই চিত্র কি পরিবর্তন হবে? এর আগে আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের বাজেট সাধারণত নির্বাহী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করত। তবে এবার আইনমন্ত্রী বাজেট প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে এনেছেন, যা একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়।
আগে বিচার বিভাগের বাজেট নিয়ে তেমন আলোচনাও হতো না। এবার বাজেট প্রস্তুতির সময়ই আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন, যা ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিচার বিভাগের আর্থিক সক্ষমতা শুধু আদালত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে না, এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও মজবুত করে। তাই বিচার বিভাগের বাজেটকে বিশেষ সুবিধা নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা প্রয়োজন—এমন মতই এখন বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তব সংকট:
২০২৫–২৬ অর্থবছরে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের শূন্য দশমিক ২৫ থেকে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ এক শতাংশেরও অর্ধেক নয়। অথচ বিভিন্ন পর্যায়ে বিচার বিভাগই বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আয়ে ভূমিকা রাখে বলে আইনমন্ত্রীও উল্লেখ করেছেন।
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ পরিচালন ও উন্নয়ন উভয় খাতে ব্যয় হবে।
বিচার বিভাগের প্রশাসনিক দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে একটি বাস্তব চিত্রও উঠে এসেছে। এক বিচারক সাক্ষীর জবানবন্দি লেখার সময় কাগজ শেষ হয়ে গেলে নতুন কাগজ কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বা অনুমোদন তার হাতে থাকে না। ফলে দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতায় মামলার পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করতে হয়। এ ধরনের ছোট ছোট সংকট বিচারপ্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার ও নীতিগত অবস্থানের প্রতিফলন। তাই বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দও কেবল ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির একটি বিনিয়োগ।
বিচার বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগ, তাদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা—সবই এই বিনিয়োগের অংশ। অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতাকে বিচারিক স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়। কারণ নির্বাহী বিভাগের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক নির্ভরতা বিচার বিভাগের কার্যকারিতা ও স্বাধীনতাকে দুর্বল করতে পারে। এ কারণে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। ই-ফাইলিং, ভার্চুয়াল শুনানি, ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক ব্যবস্থাপনা বিশ্বজুড়ে দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এসব প্রযুক্তি কার্যকরভাবে চালু করতে হলে ধারাবাহিক ও পর্যাপ্ত বাজেট প্রয়োজন। তা না হলে মামলার জট কমানো এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং মানবাধিকারের সুরক্ষার মূল ভিত্তি একটি কার্যকর বিচার ব্যবস্থা। আর সেই বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে প্রয়োজন পরিকল্পিত, পর্যাপ্ত এবং জবাবদিহিমূলক বাজেট বরাদ্দ।
বিচার বিভাগের জন্য অর্থ বরাদ্দকে বিশেষ সুবিধা হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করাই এখন মূল আলোচ্য বিষয়। কারণ সুশাসনে বিনিয়োগের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি কার্যকর কল্যাণরাষ্ট্র গঠন।
- এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

