বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আইন হিসেবে কার্যকর না করে তামাদি করেছে বিএনপি সরকার। একটি অধ্যাদেশ ছিল সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে, অন্যটি ছিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের বিধানসংক্রান্ত।
বিএনপির ব্যাখ্যা হলো, পুরোনো অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপ না দিয়ে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর নতুন আইন আনা হবে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে আরও সুসংহত করবে। তবে গত চার মাসে সে ধরনের কোনো উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায়নি।
বরং সমালোচকদের মতে, সরকার বিচার বিভাগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে পারেনি। আওয়ামী লীগের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার বিভাগ ব্যবহারের যে অভিযোগ ছিল, বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডেও তার ধারাবাহিকতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিরুদ্ধে কথিত ভুয়া মামলা দিয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রাখার যে প্রবণতা অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে দেখা গেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।
একই সঙ্গে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রেও সরকারের কোনো দৃশ্যমান প্রস্তুতি নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে বিএনপি বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে।
কিন্তু পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশটি তামাদি করার সিদ্ধান্ত সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, অধ্যাদেশগুলো আগে আইনে পরিণত করা যেত। এরপর প্রয়োজন হলে আরও উন্নত ও শক্তিশালী সংশোধনী আনার সুযোগ ছিল। সেই পথ অনুসরণ করলে নির্বাচনী অঙ্গীকার ভঙ্গের প্রশ্নও উঠত না।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। সে সময় সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি তাঁকে গ্রিক পুরাণের ‘প্রমিথিউস’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবাধীন করার চেষ্টা নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। সমালোচকদের প্রশ্ন, বর্তমান সময়েও কি বিএনপি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি? আওয়ামী লীগের গ্রেপ্তার হওয়া নেতা-কর্মীদের মামলায় বিচারকরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দিতে না পারেন— এমন আশঙ্কা থেকেই কি আবারও বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করার পুরোনো ধারা ফিরে আসছে, সেই প্রশ্নও উঠছে।
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার স্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে ক্ষমতায় আসা কোনো সরকারই সেই সাংবিধানিক অঙ্গীকার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
এদিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য ঐতিহাসিক মাসদার হোসাইন মামলার রায়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত সেই রায় ঘোষণার পরও প্রায় তিন দশক কেটে গেছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি ও আওয়ামী লীগ— উভয় দলই কার্যকর সংস্কারের বদলে ভিন্ন পথে হেঁটেছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
এর ফল হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ থেকে শুরু করে নিম্ন আদালত পর্যন্ত বিচারক নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দলীয় প্রভাবের বাইরে রাখা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ থেকে নিম্ন আদালতকে সম্পূর্ণ পৃথক করার উদ্যোগও দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক বাধার মুখে আটকে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদকে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
গণঅভ্যুত্থানের পর মব সন্ত্রাসের মুখে প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতির পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়া সবাই বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদের জুনিয়র ছিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী সৈয়দ রেফাত আহমদ হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবুও শেখ হাসিনার শাসনামলে তাঁকে অগ্রাহ্য করে তাঁর পরে নিয়োগ পাওয়া আরও কয়েকজনকে আপিল বিভাগের বিচারপতি করা হয়।
সমালোচকদের দাবি, সরকারের প্রতি অনুগত অবস্থান গ্রহণে অনিচ্ছুক থাকায় তিনি এমন বঞ্চনার শিকার হন। দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী প্রয়াত ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ এবং জাতীয় অধ্যাপক প্রয়াত সুফিয়া আহমদের সন্তান সৈয়দ রেফাত আহমদের এই অভিজ্ঞতাকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাব্য পরিণতির একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম মোকাবিলায় বিএনপি সরকার কঠোর কৌশল গ্রহণ করেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছে। সেই প্রেক্ষাপটে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় খুব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে না বলেও ধারণা করা হচ্ছে। তবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আইনে রূপ না দিয়ে তামাদি হতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতি সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগে ব্যাপক দলীয়করণের অভিযোগ ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিদের অনেকেই আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত হন। এরপর উচ্চ আদালতে যে পরিবর্তন আসে, তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধা বিএনপি পেয়েছে বলে আলোচনায় উঠে আসে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, বিচার বিভাগ যদি আগের মতোই রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে থেকে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব বিএনপিকেও বহন করতে হতে পারে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদারে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়ে একটি নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করেছিলেন। তাঁর সেই উদ্যোগের ফলে অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুটি অধ্যাদেশ জারি করে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, ড. মইনুল ইসলাম এ উদ্যোগের জন্য সৈয়দ রেফাত আহমদকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মাধ্যমে অবসরে যাওয়ার ঠিক আগে তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে গেছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের মাধ্যমে আবারও বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করতে না পারে, সে বিষয়ে জাতিকে সব সময় সচেতন থাকতে হবে।
প্রফেসর, ড. মইনুল ইসলামের ভাষ্য, সেই আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের সব অংশকে সতর্ক ও সচেতন থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাই তিনি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
দুটি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ হয়তো একটি আইনি সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে এর প্রভাব বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর কতটা পড়বে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত বিচার বিভাগ কি সংবিধানের চেতনা অনুযায়ী স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারবে, নাকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তার অবস্থানও বদলে যাবে— সেই উত্তরই সময়ের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

