বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা হলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন অনেকটাই উপেক্ষিত থেকে গেছে। প্রশ্নটি হলো—একজন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা আসলে কে?
প্রতি বছর বিসিএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিষয় প্রায়ই চোখে পড়ে, যা অনেকের কাছেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন সুপারিশপ্রাপ্ত কিছু সরকারি কর্মচারী নিজেদের “নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট” হিসেবে উপস্থাপন করেন। বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয় বিভ্রান্তি এবং বিতর্ক।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—তাঁরা কি সহকারী কমিশনার, নাকি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট? প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি ছোট বা তুচ্ছ মনে হতে পারে। অনেকেই ভাবতে পারেন, এতে কী-ই বা আসে যায়। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রে পরিচয় কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। একজন কর্মকর্তাকে রাষ্ট্র যে নামে চিহ্নিত করে, সেই পরিচয়ই তাঁর সাংবিধানিক অবস্থান, ক্ষমতার উৎস এবং জবাবদিহির সীমা নির্ধারণ করে। তাই “পদ” এবং “ক্ষমতা”কে এক করে দেখা শুধু ভাষাগত ভুল নয়, এটি সাংবিধানিক দর্শনের সাথেও সম্পর্কিত।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা বিভিন্ন পরিচিতিমূলক লেখায় প্রায়ই দেখা যায়—“বিসিএসে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত”। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন কোনোভাবেই সরাসরি এমন কোনো পদে কাউকে সুপারিশ করে না। এই বিভ্রান্তি মূলত পদবী ও দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব থেকে তৈরি হচ্ছে, যা প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
আইন ও বিধিমালা কী বলে:
বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় “সিভিল সার্ভিস (বয়স, যোগ্যতা ও সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৪” অনুযায়ী। এই বিধিমালায় প্রতিটি ক্যাডারের জন্য প্রবেশ পর্যায়ের পদ নির্ধারিত রয়েছে।
প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষেত্রে সেই প্রাথমিক পদ হলো সহকারী কমিশনার। নিয়োগপত্রেও সাধারণত উল্লেখ থাকে “সহকারী কমিশনার (শিক্ষানবিশ)”। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরাসরি এই পদেই সুপারিশ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাষায় একজন নবীন প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা প্রথম অবস্থায় “সহকারী কমিশনার” হিসেবেই যোগ দেন, “নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট” হিসেবে নয়।
এখন প্রশ্ন আসে—তাহলে “নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট” ধারণাটি কোথা থেকে আসে? এর উত্তর পাওয়া যায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১০ নম্বর ধারায়।
এই ধারার ১০(১) উপধারায় সরকারকে জেলা ও মহানগর এলাকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই ধারার ১০(৫) উপধারায় বলা হয়েছে, সরকার চাইলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন)-এর যেকোনো কর্মকর্তাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে এবং তার ওপর সেই ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে।
এখানে দুটি শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—appoint এবং confer powers অর্থাৎ সরকার একজন প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব দিতে পারে এবং নির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রদান করতে পারে। তবে এই বিধান কোথাও বলে না যে, বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেউ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে যান। বরং বাস্তবতা হলো, এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা একটি আইনগত আদেশ প্রয়োজন হয়। সেই আদেশ ছাড়া কোনো কর্মকর্তার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আইনি অবস্থান তৈরি হয় না।
ক্ষমতা অর্পণ বনাম নতুন পদ সৃষ্টি:
এই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে প্রশাসনিক আইনের একটি সুপরিচিত নীতি কাজ করে—“Delegation of power does not create a new office” অর্থাৎ ক্ষমতা অর্পণ কখনোই নতুন পদ সৃষ্টি করে না।
রাষ্ট্র একজন ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট পদে নিয়োগ দেয়। পরবর্তীতে প্রয়োজনে সেই ব্যক্তিকে অতিরিক্ত কিছু দায়িত্ব বা ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে কিন্তু অতিরিক্ত ক্ষমতা পাওয়া মানেই তার মূল পদ পরিবর্তিত হয়ে যায় না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন জেলা প্রশাসক নির্বাচনের সময় রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি নিজের পরিচয় রিটার্নিং অফিসার হিসেবে ব্যবহার করেন না। একইভাবে কোনো সচিব কোনো কমিশনের চেয়ারম্যান হলেও তার মূল পরিচয় থাকে সচিবই।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪ ধারার আওতায় কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হলেও তিনি নিজের পরিচয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দেন না। কারণ ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির পরিচয় নয়; পরিচয় নির্ধারিত হয় তার পদ দিয়ে। এই নীতিটি প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ ও মাজদার হোসেন মামলা:
এখানে সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করতে হবে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়; বরং বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি মৌলিক দিক।
দীর্ঘ সময় এই নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। পরে মাজদার হোসেন মামলা-তে আপিল বিভাগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং পৃথকীকরণের নির্দেশনা দেয়।
এর পর বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক হয়। তবে একই সময়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য “নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট” হিসেবে দায়িত্ব প্রদানের ব্যবস্থা বহাল থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে “ম্যাজিস্ট্রেট” শব্দটি আবারও নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে মিশে যায়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল ধারণার সঙ্গে এই অবস্থার সামঞ্জস্য কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণ ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার:
ঐতিহাসিকভাবে “ম্যাজিস্ট্রেট” ছিলেন বিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন কর্মকর্তা। ব্রিটিশ আমলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা কালেক্টর একই ব্যক্তি ছিলেন, কারণ তখন প্রশাসন ও বিচার বিভাগ আলাদা ছিল না। আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্র সেই কাঠামো থেকে সরে এসেছে। বাংলাদেশও বিচার বিভাগ পৃথক করেছে। তবুও প্রশাসনিক প্রয়োজনে “নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট” ধারণাটি টিকে আছে।
তবে প্রশাসনিক প্রয়োজন কখনোই সাংবিধানিক নীতিকে অতিক্রম করতে পারে না। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা সীমিত পরিসরে বিচারিক প্রকৃতির ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন, কিন্তু তাতে তিনি বিচারক হয়ে যান না। একইভাবে তার মূল পদও “নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট” হয়ে যায় না।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যদি আইনগতভাবে মূল পরিচয় “সহকারী কমিশনার” হয়, তবে কেন অনেকেই নিজেদের পরিচয়ের শুরুতেই “নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট” শব্দটি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? এটি কি কেবল সামাজিক মর্যাদার প্রতিফলন, নাকি ঔপনিবেশিক আমলের “ম্যাজিস্ট্রেট” পরিচয়ের প্রতি এক ধরনের মানসিক আকর্ষণ?
ব্রিটিশ শাসনামলে “ম্যাজিস্ট্রেট” ছিল ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক। বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর সেই প্রতীকের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়েছে—এমনটি বলা কঠিন কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তিগত মর্যাদাবোধ কখনোই আইনি পরিচয়ের বিকল্প হতে পারে না।
রাষ্ট্র একজন কর্মকর্তাকে আজ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিতে পারে, আবার কাল তা প্রত্যাহারও করতে পারে। কিন্তু তার মূল পদ অপরিবর্তিত থাকে—তিনি থাকেন সহকারী কমিশনারই। এই বাস্তবতাই একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—ক্ষমতা পরিবর্তনশীল, কিন্তু পদ পরিচয় স্থায়ী।
সাংবিধানিক পৃথকীকরণ ও আইনগত স্পষ্টতা:
বাংলাদেশের সংবিধান বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকে আলাদা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছে। সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলাবিষয়ক ব্যবস্থা পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দুটি সার্ভিসের অবস্থান ও পরিচয় স্বতন্ত্র।
এমন বাস্তবতায় পরিচয়ের ক্ষেত্রে এই পৃথক সীমারেখা অস্পষ্ট করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ আইনের ভাষা ও প্রশাসনিক পরিচয়ে দ্ব্যর্থতার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
রাষ্ট্র যদি একজন কর্মকর্তাকে সহকারী কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়, তাহলে তার সরকারি পরিচয়ও সেই পদবীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা স্বাভাবিক। অন্যদিকে সরকার যদি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নামে একটি স্বতন্ত্র পদ চালু করতে চায়, তাহলে সেটিকে নিয়োগবিধিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, সরকারি গেজেটের মাধ্যমে পদটি সৃষ্টি করতে হবে এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে সেই পদে নিয়োগের সুপারিশ দিতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে একদিকে সহকারী কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, অন্যদিকে সামাজিকভাবে “নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট” পরিচয়ের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা আইনগত স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক স্পষ্টতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু আদালতের কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়; এটি একটি সাংবিধানিক সংস্কৃতির অংশ। সেই সংস্কৃতিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পরিচয় হবে প্রশাসনিক পদ অনুযায়ী, আর বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের পরিচয় হবে বিচারিক দায়িত্বের ভিত্তিতে। দুটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, ক্ষমতা ও সাংবিধানিক ভিত্তি আলাদা। এই পার্থক্য যত স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, আইনের শাসনও তত বেশি শক্তিশালী হবে।
প্রশাসনের মর্যাদা বিচারিক পরিচয় গ্রহণের মাধ্যমে বাড়ে না। বরং নিজস্ব সাংবিধানিক পরিচয় ও দায়িত্বের প্রতি অবিচল থাকাই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি ও মর্যাদার পরিচয় বহন করে। একইভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তখনই পূর্ণ অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন “ম্যাজিস্ট্রেট” শব্দটি কেবল ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে নয়, বরং বিচারিক দায়িত্ব, নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসনের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা তার নিজস্ব সাংবিধানিক অবস্থান ও পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল, ধার করা কোনো পরিচয়ের ওপর নয়। একজন সহকারী কমিশনার যদি নিজের পদবীকেই মর্যাদার সঙ্গে ধারণ করেন এবং একজন বিচারক যদি বিচারিক পরিচয়ের মধ্যেই নিজের দায়িত্বকে প্রতিষ্ঠা করেন, তবেই সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদের প্রকৃত চেতনা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। পদ এবং ক্ষমতার এই মৌলিক পার্থক্যকে স্বীকৃতি দেওয়াই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি প্রকৃত সম্মান এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করার অন্যতম পূর্বশর্ত।
- লেখক : শামস নাজিব: সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার, প্রথম আলো।

