আইন পেশাকে পৃথিবীর অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও মহৎ পেশা বলা হয়। একজন আইনজীবী শুধু তার মক্কেলের প্রতিনিধি নন, তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মানুষ যখন অন্য কোথাও প্রতিকার পায় না, তখন শেষ আশ্রয় হিসেবে আদালত এবং আইনজীবীর দ্বারস্থ হয়। তাই একজন আইনজীবীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বিচারব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
কিন্তু যদি কোনো আইনজীবী নিজের অবস্থানের অপব্যবহার করেন, মক্কেলকে অযথা হয়রানি করেন, প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করেন বা ব্যক্তিগত স্বার্থে তাকে জিম্মি করার চেষ্টা করেন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন বিচারপ্রার্থী নন; প্রশ্নের মুখে পড়ে পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস। একজনের অনৈতিক আচরণের প্রভাব অনেক সময় পুরো আইন পেশার ওপর পড়ে, যদিও অধিকাংশ আইনজীবী নিষ্ঠা, সততা ও পেশাগত দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করে থাকেন।
আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য একজন আইনজীবীর অনুকূলে ওকালতনামায় স্বাক্ষর করা একটি স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী মামলায় মক্কেলের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার আইনগত ক্ষমতা পান। তবে এই প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে, কিছু আইনজীবী ওকালতনামায় স্বাক্ষর নেওয়ার পর মক্কেলের সঙ্গে যোগাযোগে অনীহা দেখান বা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন না। আবার কেউ কেউ মামলা থেকে সরে দাঁড়াতে চাইলে বা অন্য আইনজীবী নিয়োগ দিতে চাইলে নানা জটিলতার মুখে পড়েন। ফলে বিচারপ্রার্থীরা সময়, অর্থ ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, একজন বিচারপ্রার্থী চাইলে তার আইনজীবী পরিবর্তন করতে পারেন। তবে বাস্তবে নতুন আইনজীবী নিয়োগ, পূর্বের ওকালতনামা প্রত্যাহার কিংবা প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে গিয়ে অনেকেই ভোগান্তির অভিযোগ করেন। বিশেষ করে আগের আইনজীবীর সহযোগিতা না পাওয়া বা প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ার কারণে মামলার অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ওকালতনামা কোনোভাবেই একজন বিচারপ্রার্থীকে জিম্মি করার মাধ্যম হতে পারে না। এটি কেবল আদালতে প্রতিনিধিত্বের একটি আইনি অনুমোদন। তাই মক্কেলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই ক্ষমতার অপব্যবহার হলে তা পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থী।
তাদের মতে, এ ধরনের অভিযোগের কার্যকর তদন্ত ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালত প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট বার সমিতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের আইনজীবী পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা গেলে ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অনিয়ম বা অসদাচরণের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। কারণ আইন পেশার প্রকৃত মর্যাদা তখনই অটুট থাকবে, যখন প্রতিটি বিচারপ্রার্থী নিশ্চিত হবেন যে তিনি ন্যায়বিচারের পথেই এগোচ্ছেন, কোনো ধরনের হয়রানি বা অনৈতিক আচরণের শিকার হচ্ছেন না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ওকালতনামা বা একজন আইনজীবীর আচরণের নয়; এটি মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্ন। আদালতের দরজায় দাঁড়ানো একজন মানুষ যখন তার শেষ ভরসাটুকুও হারাতে শুরু করেন, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু তিনি নন—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো বিচারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা।
আইন পেশার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে তাই অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, পেশাগত নৈতিকতার কঠোর প্রয়োগ এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। কারণ মানুষ আদালতে যায় ন্যায়বিচারের আশায়, হয়রানির আশঙ্কা নিয়ে নয়। আর যে বিচারব্যবস্থা মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পারে না, সেখানে আইনের শাসনও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

