আইনজীবীর দেওয়া আইনি মতামতে ভুল থাকলেই কি তাঁকে জালিয়াত হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাংকগুলোর সতর্কতামূলক তালিকায় যুক্ত করা যাবে? ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিয়েছে—না।
২০২৬ সালের ৭ জুলাই দেওয়া এক যুগান্তকারী রায়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, কোনো আইনজীবীর পেশাগত মতামতে ভুল বা অবহেলা থাকলেও সেটিকে জালিয়াতি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। একই সঙ্গে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যাংক বা ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট সংস্থা আইনজীবীকে ‘কশন লিস্ট’ বা ‘ব্ল্যাকলিস্টে’ অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে না।
আইনি মহলে আলোচিত এই রায় আইনজীবীদের পেশাগত স্বাধীনতা, বার কাউন্সিলের সাংবিধানিক ভূমিকা এবং ভবিষ্যতে আইনজীবীদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
যে মামলাকে ঘিরে রায়:
মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আইনজীবী অজয় ভিজ, যিনি কানারা ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি একটি সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত আইনি মতামত দেন। পরে ব্যাংক দাবি করে, ওই মতামতে ত্রুটি ছিল এবং এতে ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে ব্যাংকের প্যানেল থেকে বাদ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইন্ডিয়ান ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশনের (আইবিএ) সতর্কীকরণ তালিকায় তাঁর নাম যুক্ত করা হয়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে সম্পত্তির মালিকানা যাচাইয়ে অবহেলার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অজয় ভিজ এলাহাবাদ হাইকোর্টে রিট আবেদন করলেও আদালত তা খারিজ করে দেন। হাইকোর্টের মত ছিল, আইবিএ সংবিধানের ধারা ১২ অনুযায়ী ‘রাষ্ট্র’ নয়, তাই তার বিরুদ্ধে রিট গ্রহণযোগ্য নয়।
হাইকোর্টের রায় বাতিল:
পরবর্তীতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। আদালত বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র না হলেও যদি তাদের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তির অধিকার বা পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলে এবং তারা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করে, তাহলে সংবিধানের ২২৬ অনুচ্ছেদের আওতায় তাদের বিরুদ্ধে রিট করা যাবে।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে বলেন, পেশাগত অবহেলা এবং জালিয়াতি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সতর্কীকরণ তালিকা কেবল প্রতারণা, অসততা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অজয় ভিজের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ ছিল না। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল কেবল পেশাগত অবহেলার। ফলে তাঁকে জালিয়াতির সঙ্গে একই কাতারে ফেলে সতর্কীকরণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ব্যাংকের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ:
রায়ে আদালত আরও বলেন, কোনো ব্যাংক চাইলে চুক্তিভিত্তিক সম্পর্কের ভিত্তিতে একজন আইনজীবীকে তাদের নিজস্ব প্যানেল থেকে বাদ দিতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্তকে ভিত্তি করে অন্য সব ব্যাংকের কাছে তাঁকে অযোগ্য বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা ব্যাংকের নেই। আদালতের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ একজন আইনজীবীর পেশাগত সুনাম ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
বার কাউন্সিলই একমাত্র কর্তৃপক্ষ:
সুপ্রিম কোর্ট ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের উল্লেখ করে বলেন, কোনো আইনজীবীর পেশাগত আচরণ, অবহেলা বা অসদাচরণের বিচার করার একমাত্র বৈধ প্রতিষ্ঠান হলো বার কাউন্সিল। আদালত উল্লেখ করেন, আইনজীবীদের পেশাগত শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তাঁদের সমকক্ষদের হাতেই থাকা উচিত। এটিই আইনি পেশার স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক ভিত্তি।
রায়ে আদালত আগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার নজির টেনে বলেন, আইন পেশা সাধারণ বাণিজ্যিক পেশা নয়। এটি বিচারব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সমাজসেবামূলক একটি পেশা। আইনজীবীরা আদালতের কর্মকর্তা হিসেবে বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই তাঁদের পেশাগত মূল্যায়ন বা শাস্তির বিষয়টি কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
বার কাউন্সিলের জন্য নতুন নির্দেশনা:
এই মামলার রায়ের পাশাপাশি বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার জন্যও দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। প্রথমত, শৃঙ্খলাভঙ্গ সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়নে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করতে হবে। কত অভিযোগ জমা হয়েছে, কতগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে এবং নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগছে—এসব বিষয় পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আইনজীবীদের নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ধারাবাহিক আইনি প্রশিক্ষণ (Continuing Legal Education) চালু এবং বিচারকদের জাতীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের আদলে একটি ন্যাশনাল লিগ্যাল একাডেমি গঠনের সুপারিশ করেছেন আদালত।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আইন, প্রযুক্তি ও বিচারব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই একজন আইনজীবীর তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও নিয়মিত নতুন আইন, প্রযুক্তি, পেশাগত নৈতিকতা এবং আদালত পরিচালনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে আইনজীবীদের পেশাগত স্বাধীনতা, বার কাউন্সিলের কর্তৃত্ব এবং আইনি পেশার স্বশাসনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- লেখক: মোঃ করমুল্লাহ, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

