দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘ফোর্সড লোন’। বিশেষ করে আমদানি ও রপ্তানিভিত্তিক বাণিজ্য অর্থায়নে নন-ফান্ডেড দায় জোরপূর্বক ঋণে পরিণত হওয়ায় খেলাপি ঋণের চাপ দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান কমছে এবং ঋণঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)।
আজ বুধবার (৮ জুলাই) বিআইবিএম আয়োজিত ‘ট্রেড সার্ভিস অপারেশন অব ব্যাংক’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানের প্রফেসর (সিলেকশন গ্রেড) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। কর্মশালায় দেশের জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরা অংশ নেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংকের বাণিজ্য অর্থায়নে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানে ঋণের মানের অবনতি ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। এসব ব্যাংকে বাণিজ্য অর্থায়ন-সংক্রান্ত খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে, যেসব ব্যাংকের সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার আগে থেকেই বেশি এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে, সেখানে বাণিজ্য অর্থায়ন-সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশেরও বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে রপ্তানি অর্থায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ ব্যাংকারের মতে, আইনগতভাবে কার্যকর ও বৈধ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ছাড়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার প্রবণতা খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাধারণত নিশ্চিত রপ্তানি আদেশের বিপরীতে উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবহৃত হয়। তবে সংশ্লিষ্ট চুক্তি দুর্বল বা আইনগতভাবে কার্যকর না হলে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আয় আসে না। ফলে সেই অর্থায়ন দ্রুত ফোর্সড লোনে রূপ নেয় এবং পরবর্তীতে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়ে ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়ায়।
কর্মশালায় বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচারের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অর্থপাচারে পণ্যের মূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি বা কম দেখানো, একই চালানের বিপরীতে একাধিক বিল তৈরি, পণ্য পাঠানো ছাড়াই চালান দেখানো, পণ্যের ভুল তথ্য প্রদান কিংবা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেনের মতো কৌশল ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করায় এসব জালিয়াতি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক বিশ্লেষণে ৮৫৩টি সন্দেহজনক লেনদেনের মধ্যে ৬১০টিতে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বস্ত্র, ধাতু, কৃষিপণ্য ও যানবাহন খাতে এ ধরনের অনিয়ম তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
ড. আহসান হাবীব বলেন, ব্যাংক, কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় এখনো যথেষ্ট কার্যকর না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের অর্থপাচার সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
গবেষণায় সুপারিশ করা হয়েছে, অর্থপাচার প্রতিরোধে লেনদেনসংক্রান্ত নথি আরও কঠোরভাবে যাচাই, গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর জোর দিতে হবে। এতে অর্থপাচার রোধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বচ্ছতাও বাড়বে।
কর্মশালায় বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কাগজবিহীন করতে আধুনিক আইনগত ও ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, নতুন আর্থিক পণ্য চালু, কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ, পণ্যভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ এবং ঋণের মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। তিন মাস আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ অঙ্ক ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।

