আপনি নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন এবং একজন সচেতন করদাতা। এমন অবস্থায় যদি জানতে পারেন যে আপনার কর ফাইল অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়েছে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে জানতে পারবেন আপনার ফাইল অডিটে গেছে?
করদাতাকে অডিট সম্পর্কে বিভিন্ন উপায়ে অবহিত করা হতে পারে। যেমন—
- সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে আপনার নিবন্ধিত ঠিকানায় একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হতে পারে।
- আপনার নিবন্ধিত ই-মেইল ঠিকানায় একই ধরনের নোটিশ পাঠানো হতে পারে।
- কোনো আইনজীবী বা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমেও আপনি এ বিষয়ে জানতে পারেন।
প্রথম চিঠির গুরুত্ব কী?
অডিট সংক্রান্ত প্রথম নোটিশটি মূলত একটি প্রস্তুতিমূলক বার্তা। এতে উল্লেখ থাকে, কোন করবর্ষের আয়কর রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এই নোটিশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট করবর্ষের রিটার্ন, আয়-ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংক নথি, বিনিয়োগের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সংগ্রহ করে সুশৃঙ্খলভাবে প্রস্তুত রাখা উচিত। একই সঙ্গে অডিট টিমের সম্ভাব্য প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক উত্তর দেওয়ার জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।
অডিটের উদ্দেশ্য কী?
কর প্রশাসনের অডিট কার্যক্রমকে ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মূল লক্ষ্য হলো রিটার্নে কোনো অসঙ্গতি বা ভুল থাকলে তা যাচাই ও প্রয়োজনে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা। তাই অডিটের নোটিশ পেলে অযথা উদ্বিগ্ন না হয়ে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত থাকাই একজন দায়িত্বশীল করদাতার করণীয়।
কর ফাইল অডিটে পড়লে করদাতার করণীয় ও যেসব বিষয় এড়িয়ে চলবেন:
কর ফাইল অডিটের নোটিশ পাওয়ার পর সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতারণা বা বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকাও জরুরি। নিচে করদাতার করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো। করদাতার করণীয়:
- অডিট-সংক্রান্ত চিঠি পাওয়ার পর সেটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ কারও সহায়তায় পুরো বিষয়টি বুঝে নিন।
- নোটিশে উল্লেখিত করবর্ষের আয়কর রিটার্ন বের করে পুনরায় পর্যালোচনা করুন।
- রিটার্নে কোনো তথ্যগত ভুল, অসঙ্গতি বা ঘাটতি রয়েছে কি না তা যাচাই করুন।
- সংশ্লিষ্ট করবর্ষের আয়, ব্যয়, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ করুন।
- নিজে সময় দিতে না পারলে একজন যোগ্য আইনজীবী বা কর–পরামর্শকের সহায়তা নিয়ে অডিটের প্রস্তুতি সম্পন্ন করুন।
যেসব বিষয় এড়িয়ে চলবেন:
- অডিটের কথা বলে কোনো অচেনা ব্যক্তির ফোন পেয়ে আতঙ্কিত হবেন না। সাধারণভাবে কর অফিস অডিটের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিশের পরিবর্তে ফোন করে যোগাযোগ করে না।
- কেউ ফোনে আপনার কর ফাইল নিয়ে ভয় দেখিয়ে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা দাবি করলে সেটিকে প্রতারণার চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করুন।
- এ ধরনের পরিস্থিতিতে শান্তভাবে জানিয়ে দিন, “আমার কর ফাইল সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক বিষয় থাকলে দয়া করে লিখিতভাবে নোটিশ পাঠান।
- কোনো ব্যক্তি নিজেকে কর কর্মকর্তা, আইনজীবী বা মধ্যস্থতাকারী পরিচয় দিয়ে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে সতর্ক থাকুন। পরিচয় যাচাই না করে কোনো তথ্য বা অর্থ লেনদেন করবেন না এবং এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব এড়িয়ে চলুন।
কর ফাইল অডিটে আইনি প্রক্রিয়া ও করদাতার অধিকার:
কর ফাইল অডিট একটি নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া। তাই অডিটের নোটিশ পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করলে করদাতা নিজের অধিকার নিশ্চিত করতে পারেন। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণভাবে নিম্নরূপ—
প্রথম ধাপ: অডিটের নোটিশ ও প্রস্তুতির সুযোগ:
প্রাথমিক নোটিশ পাওয়ার পর করদাতাকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৮২(৩) ধারা অনুযায়ী আরেকটি চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেন—
- অডিট কবে হবে;
- অডিট টিমে কারা থাকবেন;
- তারা কখন ও কোথায় করদাতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
নির্ধারিত সময়ে অডিট টিম করদাতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রিটার্নে দেওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে। প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে করদাতার সঙ্গে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৮২(৬) ধারা অনুযায়ী অডিট প্রতিবেদনের একটি খসড়া করদাতাকে দেওয়া হয়। প্রতিবেদনের কোনো বিষয়ে আপত্তি বা মতামত থাকলে তা লিখিতভাবে জমা দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়।
দ্বিতীয় ধাপ: চূড়ান্ত অডিট প্রতিবেদন:
অডিট শেষে যদি রিটার্ন সংশোধন বা অতিরিক্ত কর পরিশোধের প্রয়োজন হয়, তাহলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৮২(১০)(ক) ধারা অনুযায়ী উপকর কমিশনার করদাতার কাছে পূর্ণাঙ্গ অডিট প্রতিবেদন পাঠান। এ সময় সংশোধিত রিটার্ন দাখিল এবং প্রযোজ্য কর পরিশোধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
তৃতীয় ধাপ: অডিট সমাপ্তির নোটিশ:
সব কার্যক্রম শেষ হলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৮২(১১) ধারা অনুযায়ী করদাতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে অডিট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। অডিট একটি ধারাবাহিক আইনি প্রক্রিয়া। এটি চলমান থাকলেও করদাতার অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম কিংবা নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই চলতে পারে। তাই অডিটের জন্য নির্বাচিত হওয়া মানেই কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়; বরং আইন অনুযায়ী তথ্য যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া।
কেন আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি:
আইনি বিধান মেনে অডিট সম্পন্ন করলে করদাতা নিজের অধিকার রক্ষা করতে পারেন এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক নজির তৈরি হয়। একই সঙ্গে অডিট-সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্ন বা আপত্তি যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগও নিশ্চিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করদাতাকে অযথা হয়রানির প্রবণতা থেকে সংশ্লিষ্ট সবার সরে আসা উচিত। কারণ একজন করদাতা রাষ্ট্রের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। নাগরিকদের দেওয়া করের ওপরই রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাই করদাতার প্রতি সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি কর কর্মকর্তাদেরও আইন ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন।
এ ধরনের স্বচ্ছ ও বিধিবদ্ধ অডিট প্রক্রিয়া একদিকে করদাতাদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি করবে, অন্যদিকে কর প্রদান সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। ফলে কর প্রশাসন ও নাগরিক—উভয় পক্ষের মধ্যেই বিশ্বাস ও সহযোগিতার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।

