সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে বহুল আলোচিত মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এ রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, এর ফলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অ্যাটর্নি জেনারেল এ মন্তব্য করেন।
আপিল শুনানিতে রিটকারী ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জেল হোসেনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
এর আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ মামলাটির শুনানি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর করার নির্দেশ দিয়ে তা মুলতবি রেখেছিলেন। সেই সময় রিটকারীর পক্ষে ড. শরীফ ভূঁইয়া শুনানি করেন। ইন্টারভেনর হিসেবে বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির এবং ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
পরবর্তীতে ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত শুনানিতে ড. শরীফ ভূঁইয়া আদালতের কাছে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিলের আবেদন জানান। শুনানির একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, যদি সংশোধনী প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থেকে থাকে, তবে পুরো সংশোধনী বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে। এর আগে ২ ডিসেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মামলায় পক্ষভুক্ত হওয়ার অনুমতি পান।
হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়:
২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তকারী বিধান বাতিল এবং গণভোটের সাংবিধানিক ব্যবস্থা পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, গণতন্ত্র সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্রের কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব। আদালতের মতে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি এবং জনগণের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। আদালত আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।
কোন কোন বিধান বাতিল হয়েছিল:
হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদকে সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করেন। আদালতের মতে, এসব বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত সংবিধানের ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও বাতিল ঘোষণা করা হয়।
রায়ে আদালত স্পষ্ট করেন, পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা হয়নি। সংশোধনীর অন্যান্য বিধান বহাল থাকবে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ প্রয়োজন হলে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সেগুলো সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তন করতে পারবে। আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, জাতির পিতার স্বীকৃতি ও ২৬ মার্চের ভাষণসংক্রান্ত বিধানসহ অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সংসদের ওপরই ন্যস্ত থাকবে।
গণভোটের বিধান পুনর্বহাল:
গণভোটের বিষয়ে হাইকোর্ট বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধান পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছিল। আদালতের মতে, ওই পরিবর্তন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে পঞ্চদশ সংশোধনীর ৪৭ ধারা বাতিল করে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায় ও আপিল:
পরবর্তীতে হাইকোর্ট ১৩৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর স্বাক্ষরের পর রায়টি প্রকাশিত হয়।
এরপর রিটকারী ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করেন। ওই আবেদনে পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন বাতিলের আবেদন জানানো হয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আপিলের অনুমতি দেন এবং সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সেই আপিল খারিজ করে দেন।
এই রায়ের পর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়েছে বলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মন্তব্য করেন।

