সংবিধানের বহুল আলোচিত পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি অংশ অসাংবিধানিক ঘোষণা করে সেগুলো বাতিলের রায় দেওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মোড় হিসেবে দেখছেন।
এ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, গণভোটের বিধান এবং সংবিধানের কিছু তথাকথিত ‘অসংশোধনীয়’ ধারা নিয়ে নতুন আইনি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন কার্যকর করতে সংসদকে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধন আনতে হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পথ উন্মুক্ত করায় দলটি সন্তুষ্ট। তাঁর ভাষ্য, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর এবং আদালতের এই সিদ্ধান্তে দেশবাসীও আনন্দিত।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর সংসদের ভূমিকা:
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আদালতের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সংবিধানের ভাষা ও বিধান সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংসদকে আনুষ্ঠানিক সংশোধনী আনতে হবে। তাদের ধারণা, সরকার চাইলে একটি সমন্বিত সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে উপস্থাপন করতে পারে। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণভোট, ৭ক, ৭খ, ৪৪(২) অনুচ্ছেদসহ আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসা সব বিষয় একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সংসদের দায়িত্ব হবে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর ভাষা পুনর্গঠন করা। তিনি বলেন, কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। আদালত যেসব বিধানকে অসাংবিধানিক বলেছেন, সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য অনুচ্ছেদেও প্রয়োজনীয় সমন্বয় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক জটিলতা না তৈরি হয়।
ড. শাহদীন মালিক আরও বলেন, কোনো আইন বা বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার ক্ষমতা আদালতের থাকলেও নতুন আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা একমাত্র জাতীয় সংসদের। ফলে আদালতের রায়ের মাধ্যমে কোনো বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে না; প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধন সংসদকেই করতে হবে।
আইনি অসামঞ্জস্য দূর করতে হবে:
সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে মামলায় অংশ নেওয়া জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, আপিল বিভাগ হাই কোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রাখায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত বিধান কার্যকরভাবে বাতিল হয়েছে। তবে তাঁর মতে, এর ফলে সংবিধানে কিছু আইনি ও কারিগরি অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে, যা সংসদের মাধ্যমে দূর করতে হবে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, হাই কোর্ট সব সংশ্লিষ্ট বিধান বাতিল করেননি। ফলে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের শপথ গ্রহণের বিধান কিংবা বিচারপতির প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়নি। একই সঙ্গে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বর্তমান বিধান বহাল থাকলে ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ড. শরীফ ভূঁইয়া জানান, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হবে। প্রয়োজন হলে রিভিউ আবেদনও করা হতে পারে।
যেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে:
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। পরে হাই কোর্ট সেই সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে এবং আপিল বিভাগও সেই অবস্থান বহাল রাখে।
এর ফলে আইনজ্ঞদের মতে, সংবিধানের ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮ঙ অনুচ্ছেদে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধান আবারও কার্যকর হওয়ার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো, উপদেষ্টা নিয়োগের পদ্ধতি এবং ক্ষমতার সীমা নতুনভাবে নির্ধারণের সুযোগ সংসদের হাতে থাকবে।
এ ছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। হাই কোর্ট সেই অংশ বাতিল করেন এবং আপিল বিভাগও তা বহাল রাখে। ফলে সংবিধানের মৌলিক কিছু বিষয়ে ভবিষ্যতে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার সাংবিধানিক ভিত্তি আবারও তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে গণভোট আয়োজনের পদ্ধতি, ক্ষেত্র এবং সীমা নির্ধারণে সংসদকে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হতে পারে।
একইভাবে, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদও হাই কোর্ট সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেছিলেন। ৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করার অপরাধের শাস্তির বিধান এবং ৭খ অনুচ্ছেদে সংবিধানের কিছু অংশকে সংশোধনের বাইরে রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। আপিল বিভাগের রায়ে সেই সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় এসব অনুচ্ছেদ পুনর্লিখন বা অপসারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তাদের মতে, বিশেষ করে ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল হওয়ায় সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতার ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ৪৪(২) অনুচ্ছেদও হাই কোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। এ বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে পরবর্তী করণীয় আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরাতে হবে আইনগত পরিবর্তন:
আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পথ উন্মুক্ত হলেও বিষয়টি কার্যকর করতে জাতীয় সংসদকে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালত আইনি ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিলেও চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও আইন প্রণয়নের দায়িত্ব সংসদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। এ কারণে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে হলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৯৯, ১২৩, ১৪৭, ১৫২ অনুচ্ছেদ এবং তৃতীয় তফসিলে আনা পরিবর্তনগুলো পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন করতে হবে।
আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতের রায়ের পর সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং ৮, ৯, ১১, ১২ ও ২৫ অনুচ্ছেদসংক্রান্ত বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সংসদের ওপরই রয়েছে। এসব বিষয় পর্যালোচনার জন্য শিগগিরই একটি সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারদলীয় জোট এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পর থেকেই সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছেন। সংসদীয় কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আদালতের পর্যবেক্ষণের আলোকে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা সাংবিধানিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, আপিল বিভাগের রায়ে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে এবং এটি সংসদের মাধ্যমেই সম্পন্ন করতে হবে। তাঁর মতে, সংবিধান ঘন ঘন পরিবর্তনের বিষয় নয়। একবার সংশোধন হলে সেটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় রেখে কাজ করতে হয়। সে কারণেই একটি সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে সুপারিশ দেবে।
অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, আগামী সংসদ অধিবেশনেই সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন ও পাসের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন চলছে, যা ১৫ জুলাই পর্যন্ত চলার কথা। সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, এরপর দুই মাসের মধ্যেই পরবর্তী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সম্ভাবনা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, সংসদের মাধ্যমেও এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিল। তবে আদালতের রায়ের ফলে সংসদের জন্য বিষয়টি আরও সহজ হয়েছে। তাঁর মতে, সরকারি দলের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে এবং বিরোধী দলেরও এ বিষয়ে পূর্ব থেকেই সমর্থন আছে। ফলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন সম্ভব হলে তা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতি ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান নিয়েছে। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ অন্যায়ভাবে এই ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছে এবং এর প্রতিবাদে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে বিবৃতি, কর্মসূচি ও আন্দোলন পরিচালনা করেছে।
রিজভীর ভাষ্য, যে রাজনৈতিক দল একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করেছিল, পরবর্তীতে তারাই ক্ষমতায় গিয়ে সেই ব্যবস্থাই বাতিল করেছে। তাঁর অভিযোগ, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন সরকার একতরফা মনোভাব অনুসরণ করেছে। আপিল বিভাগের রায়ের পর সংসদের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন বিষয়টি জাতীয় সংসদে যাবে এবং সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে প্রয়োজনীয় আইনগত ও সাংবিধানিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকেই এটি দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক আপিল বিভাগের রায়ের পর বিষয়টি আর শুধু আদালতের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; এখন প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পরিবর্তন আনার প্রশ্নে জাতীয় সংসদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

