দেশে জাল মুদ্রার বিস্তার ঠেকাতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার। জাল নোট তৈরি, কেনাবেচা, ব্যবহার, মজুত, পরিবহন ও পাচারসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ উদ্দেশ্যে ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
খসড়া আইনে জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের অর্থমূল্যের দ্বিগুণ অথবা ন্যূনতম এক কোটি টাকা—যেটি বেশি হবে—সেই পরিমাণ অর্থদণ্ড আরোপের বিধানও রাখা হয়েছে।
নতুন আইনের খসড়া অনুযায়ী, জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অপরাধের তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত বিধানে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং কোস্ট গার্ড প্রয়োজন হলে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি চালাতে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রচলিত বৈধ মুদ্রার অনুকরণে জাল নোট তৈরি, সংরক্ষণ, ব্যবহার, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন, সরবরাহ বা এসব কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার মতো অপরাধের শাস্তি নতুনভাবে নির্ধারণের লক্ষ্যেই আইনটি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈধ মুদ্রার ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
খসড়ায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত বিষয়ে অন্য কোনো আইনে ভিন্ন বিধান থাকলেও নতুন আইন কার্যকর হলে সেটিই প্রাধান্য পাবে। কোনো বিদ্যমান আইনের বিধান যদি এই আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ অংশ কার্যকর থাকবে না।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে বিপুল পরিমাণ জাল মুদ্রা ছড়িয়ে পড়লে তা একটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এতে আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা দুর্বল হতে পারে। তাই জাল মুদ্রা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োজন হলেও, সেই আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে হবে বিশেষ কমিটি ও কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার:
প্রস্তাবিত ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী, জাল মুদ্রা প্রতিরোধে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বা তাঁর চেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন। কমিটির কাঠামো, দায়িত্ব ও কার্যপরিধি পরবর্তী সময়ে প্রণীত প্রবিধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
একই সঙ্গে জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রের তথ্য সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জাল মুদ্রার প্রস্তুতকারী, সরবরাহকারী, বহনকারী, বিপণনকারী এবং এসব কাজে ব্যবহৃত উপকরণ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।
আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের তদন্ত বা মামলার মাধ্যমে পাওয়া তথ্য নিয়মিত বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠাবে। নির্ধারিত নিয়মে এসব তথ্য সংরক্ষণ করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে সরবরাহ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এই তথ্য ব্যবহার করতে পারবে।
যেসব কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে:
খসড়া আইনে জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে স্পষ্টভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাল নোট তৈরি করা, জাল করার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া কিংবা জেনেশুনে জাল মুদ্রা সংরক্ষণ, কেনাবেচা, ব্যবহার, গ্রহণ বা আসল মুদ্রা হিসেবে লেনদেন করা। এ ছাড়া জাল মুদ্রা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল বা অন্যান্য উপকরণ তৈরি, বিক্রি, সরবরাহ, ব্যবহার, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন বা নিজের দখলে রাখাও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
আইন অনুযায়ী, জাল মুদ্রা তৈরির কৌশল উদ্ভাবন, সেই সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান অথবা অবৈধ উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট ফাইল, অডিও, ভিডিও, সফটকপি, হার্ডকপি কিংবা প্রযুক্তিগত উপাদান সংরক্ষণ করলেও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
পাশাপাশি বিদেশ থেকে বাংলাদেশে বা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে জাল মুদ্রা সরবরাহ, পরিবহন বা পাচারের ঘটনাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ব্লিচড, টেম্পার্ড ও মিসম্যাচড মুদ্রা কেনাবেচা, ব্যবহার বা নিজের কাছে রাখা নিষিদ্ধ থাকবে। এমনকি এমন কোনো মুদ্রাসদৃশ বস্তু বা দলিল তৈরি করাও অপরাধ হবে, যা সরাসরি জাল নোট না হলেও অন্য কাউকে প্রতারণার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, জাল মুদ্রা প্রতিরোধে শুধু কঠোর আইন করলেই যথেষ্ট হবে না। আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে, শক্তিশালী তদারকি ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অপরাধ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা:
খসড়া আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরোয়ানা ছাড়াই অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যৌক্তিক সন্দেহের ভিত্তিতে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ল্যান্স নায়েক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা এবং কোস্ট গার্ডের পেটি অফিসার বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা যে কোনো স্থানে প্রবেশ করে তল্লাশি চালাতে পারবেন।
তল্লাশির সময় জাল মুদ্রা প্রস্তুত, সংরক্ষণ, বিপণন বা পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে জাল মুদ্রা, এ-সংক্রান্ত লেনদেন থেকে পাওয়া দেশি বা বিদেশি মুদ্রা, চেকবই, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, কম্পিউটার, স্ক্যানার, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র, কাগজ, কালি, রাসায়নিক পদার্থ এবং অপরাধে ব্যবহৃত অন্যান্য উপকরণ জব্দ করা যাবে। তবে পুলিশ ছাড়া অন্য কোনো সংস্থা গ্রেফতার বা জব্দের অভিযান পরিচালনা করলে, তাদের দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানার কাছে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি ও জব্দকৃত আলামত হস্তান্তর করতে হবে।
কারা অভিযোগ বা মামলা করতে পারবেন:
প্রস্তাবিত ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া অনুযায়ী, জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অপরাধের ঘটনায় একাধিক পক্ষ মামলা বা অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান বা তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী থানা কিংবা সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগ বা মামলা করতে পারবেন।
তদন্ত শেষের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা:
খসড়া আইনে তদন্ত প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা কিংবা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তদন্ত পরিচালনা করবেন।
যদি কোনো ব্যক্তিকে ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়, তাহলে গ্রেফতারের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। আর হাতেনাতে গ্রেফতার না হলে প্রাথমিক তথ্য প্রাপ্তি বা তদন্তের নির্দেশ পাওয়ার দিন থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
তবে যৌক্তিক কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব না হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে অতিরিক্ত ৩০ কার্যদিবস সময় নেওয়া যাবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত প্রয়োজন মনে করলে আরও সময় বাড়ানোর ক্ষমতাও রাখবেন। খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন হলে নতুন একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অধিকতর তদন্ত শেষ করতে হবে।
তদন্তে গাফিলতির ক্ষেত্রে ব্যবস্থা:
প্রস্তাবিত আইনে তদন্ত কর্মকর্তার জবাবদিহিও নিশ্চিত করার উদ্যোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অদক্ষতা ও অসদাচরণের অভিযোগ তাঁর বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর)-এ উল্লেখ করা হবে। প্রয়োজনে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া আদালত তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে কোনো ব্যক্তিকে আসামির পরিবর্তে সাক্ষী হিসেবে বিবেচনার নির্দেশ দিতে পারবেন।
যদি তদন্তে গাফিলতি, আলামত গোপন, তথ্য বিকৃতি বা কাউকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের থাকবে। প্রয়োজনে আদালত নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের নির্দেশও দিতে পারবেন। খসড়ায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্ত চলমান অবস্থায় প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বদলি করা যাবে না।
প্রস্তাবিত ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী, জব্দ করা কোনো নোট আসল নাকি জাল—সে বিষয়ে মতামত দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার বা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ফরেনসিক ল্যাবের বিশেষজ্ঞ এবং সরকার নির্ধারিত অন্য কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের।
খসড়ায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞকে তাঁর প্রত্যয়নে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে কোন কোন বৈশিষ্ট্য বা পরীক্ষার ভিত্তিতে মুদ্রাটিকে জাল অথবা আসল হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
জাল মুদ্রা প্রস্তুত, সংরক্ষণ, পরিবহন, কেনাবেচা, ব্যবহার বা সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনার ভিডিওচিত্র, স্থিরচিত্র, অডিও রেকর্ড, ফোনালাপ, ই-মেইল কিংবা ইন্টারনেটসহ অন্য যেকোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংরক্ষিত তথ্য আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে, জব্দ করা আলামত সরকার বা আদালত মনোনীত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তিনি প্রচলিত বিধি অনুযায়ী এসব আলামত সংরক্ষণ, বিচারকার্যে ব্যবহার, হস্তান্তর, নিলাম অথবা অন্য উপায়ে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করবেন। জব্দ হওয়া বৈধ দেশি বা বিদেশি মুদ্রা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। আর কোনো ব্যাংকে জাল নোট শনাক্ত হলে সে ক্ষেত্রে করণীয় বাংলাদেশ ব্যাংক পৃথক প্রবিধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, জাল মুদ্রার ব্যবসা শুধু অবৈধই নয়, এটি অত্যন্ত অনৈতিকও। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে প্রায়ই কালোবাজারি, অর্থপাচার এবং মানবপাচারের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধের সম্পর্ক থাকে। তাই জাল মুদ্রা দমনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
গুরুতর অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের প্রস্তাব:
খসড়া আইনে জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের দ্বিগুণ অর্থমূল্য অথবা ন্যূনতম এক কোটি টাকা—যেটি বেশি হবে—সেই পরিমাণ অর্থদণ্ড আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
এ ছাড়া জেনেশুনে জাল মুদ্রা বা বৈধ মুদ্রা নিয়ে গুজব ছড়ালে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
যদি কেউ জাল নোট তৈরির উদ্দেশ্যে নয়, কিন্তু এমন কোনো মুদ্রাসদৃশ বস্তু বা দলিল তৈরি করেন যা ব্যবহার করে অন্য কাউকে প্রতারণা করা সম্ভব, তাহলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অতিরিক্ত দুই মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, এ আইনের আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ সংঘটনে কেউ সহায়তা করলে এবং সেই সহায়তায় অপরাধ সংঘটিত হয় বা তার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সহায়তাকারীকেও মূল অপরাধীর সমান শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
জামিন ও বিচার প্রক্রিয়া:
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত সব অপরাধ আমলযোগ্য, অ-আপসযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে। এসব মামলার বিচার করবেন দায়রা জজ আদালত, অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত, মহানগর দায়রা জজ আদালত অথবা অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। আইনে আলাদা কোনো বিধান না থাকলে গ্রেফতার, তদন্ত, তল্লাশি, জব্দ, বিচার ও মামলার নিষ্পত্তিতে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুসরণ করা হবে। বিচারিক আদালতের রায়ে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে রায় বা দণ্ডাদেশ ঘোষণার তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারবেন।
খসড়া অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শের ভিত্তিতে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করে জাল মুদ্রা তৈরিতে ব্যবহৃত কাগজ, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণের উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিক্রি, সরবরাহ এবং আমদানি-রপ্তানির ওপর প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে।
এ ছাড়া সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী বিধি প্রণয়ন করবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবিধান জারি করতে পারবে। আইনের একটি নির্ভরযোগ্য ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশ করা হবে। তবে বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য দেখা দিলে বাংলা সংস্করণই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, জাল মুদ্রা একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। বিপুল পরিমাণ জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে পড়লে আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়, যার নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, জাল মুদ্রা তৈরি, বহন ও প্রচারের মতো অপরাধ দমনে কঠোর আইন প্রয়োজন। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থার সমন্বিত তৎপরতা ও নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমেই জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অপরাধ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, যদি তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।
জাল মুদ্রা শুধু কিছু নোটের প্রতারণা নয়; এটি একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থা, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং মানুষের আস্থার ওপর সরাসরি আঘাত হানে। তাই কঠোর আইন প্রণয়ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শেষ পর্যন্ত আইনের সফলতা নির্ভর করবে তার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। কারণ আইন যতই কঠোর হোক, যদি তার প্রয়োগে দুর্বলতা থাকে, তাহলে অপরাধচক্র নতুন পথ খুঁজে নেবে। আর যদি আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়, তবে জাল মুদ্রার মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

