একসময় একটি প্রচলিত কথা প্রায়ই শোনা যেত—”যার আর কোনো পথ নেই, তিনি ওকালতি করেন।” এর সঙ্গে সমাজে আইনজীবীদের নিয়ে আরও কিছু নেতিবাচক ধারণাও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। কেউ বলেন আইনজীবীরা অযথা ফি নেন, কেউ আবার অভিযোগ করেন তারা সত্যকে জটিল করে তোলেন কিন্তু খুব কম মানুষই উপলব্ধি করেন, একজন আইনজীবীর জ্ঞান, সময় ও অভিজ্ঞতাও একটি পেশাগত সেবা, যার যথাযথ মূল্য থাকা স্বাভাবিক।
বাস্তবে আমাদের সমাজে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেকেই ধরে নেন আইনজীবীর কাছ থেকে প্রাথমিক আইনি পরামর্শ বিনা খরচেই পাওয়া উচিত। অথচ একজন আইনজীবী হতে দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, কঠিন পেশাগত পরীক্ষা এবং বছরের পর বছর অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেই শ্রমের মূল্য না দিয়ে বিনামূল্যে পরামর্শ প্রত্যাশা করা পেশাটির প্রতি এক ধরনের অবমূল্যায়ন।
বিশ্বখ্যাত আইনবিদ রসকো পাউন্ড আইনজীবীদের সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কারণ, আইনজীবীরা শুধু আদালতে মামলা পরিচালনা করেন না; সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু যদি তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্য না দেওয়া হয়, তবে পেশাগত উৎকর্ষ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ওকালতি পেশার বর্তমান বাস্তবতা:
বাংলাদেশে আইন পেশার বর্তমান চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই উদ্বেগজনক। একটি মামলা দায়ের হওয়ার পর বছরের পর বছর শুনানি চলা, ফি নিয়ে আইনজীবী ও মক্কেলের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়া এবং বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
অথচ ওকালতি কেবল আইনের ধারা মুখস্থ করার বিষয় নয়। এটি বিশ্লেষণ, যুক্তি, গবেষণা এবং কৌশলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি বিশেষায়িত পেশা। একজন আইনজীবী যদি প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দিতে না পারেন, তাহলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মামলার ফলাফলের ওপরই পড়ে।
বাস্তবে দেখা যায়, অনেক মক্কেল মামলার বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে রাজি থাকলেও আইনজীবীর পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে আপত্তি তোলেন। কখনও মামলা পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে দেরি করেন, কখনও প্রতিশ্রুতি দিয়েও ফি পরিশোধ করেন না। এর ফলে আইনজীবীদের একটি বড় অংশকে আইনি প্রস্তুতির চেয়ে পাওনা আদায়ের বিষয়েই বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। এতে মামলার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে মামলা পাঠানোর সময় সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে মামলা পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবীরা যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্রিফ বা পারিশ্রমিক পান না। এতে মামলার অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে। দেওয়ানি মামলাতেও একই ধরনের সমস্যার কথা অনেক আইনজীবী তুলে ধরেন। ফলে পেশাগত মনোযোগ বিভক্ত হয়ে যায় এবং মামলার প্রস্তুতি কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায় না।
আইন অঙ্গনের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কিছু মানুষের মধ্যে বিদ্যমান এই ধারণা যে, অর্থের বিনিময়ে যেকোনো মামলার ফল প্রভাবিত করা সম্ভব। এই মানসিকতা শুধু আইনজীবীর পেশাগত মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষুণ্ন করে। আইনি লড়াইয়ের পরিবর্তে বেআইনি প্রভাব বিস্তারের চিন্তা সমাজ ও বিচারব্যবস্থা—উভয়ের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
কীভাবে পরিবর্তন সম্ভব: আইন পেশাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও পেশাদার করে তুলতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
- আইনজীবীদের জন্য অভিজ্ঞতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরামর্শ ফি নির্ধারণ করা।
- মামলা গ্রহণের শুরুতেই লিখিত পারিশ্রমিক চুক্তি সম্পন্ন করা।
- মুহুরি বা মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভর ব্যবস্থা কমিয়ে আইনজীবী ও মক্কেলের সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
- মামলার প্রকৃতি ভালোভাবে যাচাই করে দায়িত্ব গ্রহণ করা।
- ঘুষ বা বেআইনি সুবিধার যেকোনো প্রস্তাব কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা।
ন্যায়বিচারের ভিত্তি হলো পারস্পরিক আস্থা:
একটি সফল বিচারব্যবস্থা কেবল আদালত বা বিচারকের ওপর নির্ভর করে না। এখানে আইনজীবী ও মক্কেল—উভয়ের দায়িত্ব রয়েছে। আইনজীবীকে দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মামলা পরিচালনা করতে হবে। একইভাবে মক্কেলকেও আইনজীবীর পেশাগত শ্রমের মূল্য দিতে হবে এবং বেআইনি উপায়ে ফল পাওয়ার চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে কারণ একজন আইনজীবীর যথাযথ প্রস্তুতি একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে অন্যায় শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে, আবার কোনো নাগরিকের বৈধ সম্পত্তিও সুরক্ষিত রাখতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, আইন পেশার মর্যাদা রক্ষা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে আইনজীবী ও মক্কেল—দুই পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। পেশাগত শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হলে আইনজীবীরা আরও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, যা শেষ পর্যন্ত বিচারপ্রার্থীদেরই উপকারে আসবে। সূত্র: ল’ ইয়ার্স

