হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন (Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৩৮ ধারায় চেকে স্বাক্ষর থাকা মাত্রই আসামির দণ্ড নিশ্চিত হয়ে যায়—এমন ধারণা আইনের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের একাধিক রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে, চেক ডিজঅনার মামলায় শুধু চেক উপস্থাপন করাই যথেষ্ট নয়। বাদীকে প্রমাণ করতে হবে, চেকটির পেছনে একটি বৈধ ও বাস্তব আর্থিক লেনদেন ছিল।
উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে এমন কয়েকটি নীতি উঠে এসেছে, যা বিশেষ করে ফাঁকা (Blank) বা জামানত (Security) হিসেবে দেওয়া চেক সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ১৩৯ ধারায় চেকধারীর পক্ষে একটি আইনি অনুমান (Presumption) তৈরি হয় যে, চেকটি কোনো দেনা বা দায় পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হয়েছে। তবে আদালত বলেছেন, এটি চূড়ান্ত নয়; এটি একটি খণ্ডনযোগ্য অনুমান।
অর্থাৎ, আসামি যদি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ বা মামলার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দিয়ে দেখাতে পারেন যে চেকটি কেবল জামানত হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, হারিয়ে গিয়েছিল বা এর বিপরীতে কোনো প্রকৃত লেনদেন ঘটেনি, তাহলে আদালত সেই অনুমান খণ্ডিত হয়েছে বলে বিবেচনা করতে পারেন।
নজির: মো. আবুল কাহের শাহিন বনাম ইমরান রশিদ ও অন্যান্য, ২৫ বিএলসি (এডি), ১১৫।
বাদীর আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ:
চেকে উল্লেখিত অর্থ আসামিকে দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা বাদীর ছিল কি না, সেটিও এখন আদালতের বিবেচ্য বিষয়। যদি বড় অঙ্কের অর্থ নগদে দেওয়ার দাবি করা হয়, তাহলে সেই অর্থের উৎস, আয়ের বৈধতা এবং কর-সংক্রান্ত নথিতে তার প্রতিফলন রয়েছে কি না—এসব বিষয় আদালত যাচাই করতে পারেন। পাশাপাশি লিখিত চুক্তি, রসিদ বা নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য না থাকলে কেবল চেকের ভিত্তিতে দাবি প্রতিষ্ঠা কঠিন হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আদালত যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের সুযোগে (Benefit of Doubt) আসামিকে খালাস দিতে পারেন।
অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বা সুদভিত্তিক লেনদেনের সময় ফাঁকা চেক নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে। আদালতের মতে, বাদী যদি বৈধভাবে অর্থ প্রদান বা দেনা সৃষ্টির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে শুধুমাত্র চেকের ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া যাবে না। নজির: ৬৪ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৪২০।
ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো চুক্তির নিরাপত্তা হিসেবে যদি একটি চেক দেওয়া হয় এবং সেই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ না হয়, তাহলে শুধু চেক অনাদায়ী হওয়ার কারণে ১৩৮ ধারায় দণ্ড আরোপ করা যাবে না—এমন ব্যাখ্যাও উচ্চ আদালতের রায়ে এসেছে।
নজির: আব্দুল আওয়াল বনাম রাষ্ট্র, ৬৩ ডিএলআর (আপিল বিভাগ), পৃষ্ঠা ৭২।
চুক্তি আইনের সাধারণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আদালত বলেছেন, বৈধ প্রতিদান (Consideration) ছাড়া কোনো লেনদেনের দাবি আইনগতভাবে টেকসই হয় না। একইভাবে, চেকের বিপরীতে প্রকৃত দেনা বা বৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ না থাকলে সেই চেকের ভিত্তিতে ১৩৮ ধারার মামলা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
নজির: লোকমান বনাম আয়ুব আলী ও রাষ্ট্র, ৩৮ বিএলডি, পৃষ্ঠা ৬১৬–৬২০।
উচ্চ আদালতের এসব রায়ের উদ্দেশ্য হলো ভুয়া, হয়রানিমূলক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চেক ডিজঅনার মামলা থেকে নির্দোষ ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সব ধরনের চেক ডিজঅনার মামলায় আসামি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খালাস পাবেন।
যদি বাদী বৈধ চুক্তি, প্রকৃত দেনা, ব্যাংকিং লেনদেন বা অন্যান্য গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণের মাধ্যমে দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় নির্ধারিত শাস্তি—কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড—প্রযোজ্য থাকবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক রায়গুলো চেক ডিজঅনার মামলায় বিচারিক মূল্যায়নকে আরও প্রমাণনির্ভর করেছে। ফলে এখন শুধু চেকে স্বাক্ষর থাকা নয়, বরং সেই চেকের পেছনের লেনদেনের বৈধতা ও বাস্তবতা প্রমাণ করাও মামলার নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
লেখক: অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক, আইনজীবী (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট), আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও গবেষক।

