উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেউ যদি আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে এবং এর ফলে আপনি সামাজিক, মানসিক কিংবা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন, তাহলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ও ফৌজদারী কার্যবিধির বিধান অনুসারে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই মামলার বাদীর বিরুদ্ধেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে জেল, জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণের দাবিও উত্থাপন করা যেতে পারে।
কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কাউকে মিথ্যা মামলায় জড়ান এবং পরে অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালত থেকে খালাস পান, মামলায় অব্যাহতি লাভ করেন অথবা তদন্ত শেষে ফাইনাল রিপোর্টে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া যায়, তাহলে সেই মামলাটি মিথ্যা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি মামলার বাদীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে পারেন। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। তবে বাদীর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির অব্যাহতি বা খালাস পাওয়া প্রয়োজন। মামলার নিষ্পত্তির আগেই এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, অভিযোগের পরও যদি ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তাহলে ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৭৬ (বি) ধারার অধীনে সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতে আপিল করা যাবে। প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে রিভিশনের জন্য হাইকোর্টেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
মিথ্যা মামলায় আদালতের ক্ষমতা কী? আইনে রয়েছে একাধিক শাস্তির বিধান:
মিথ্যা মামলার অভিযোগ আদালতের সামনে এলে আইন অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ফৌজদারী কার্যবিধির ২৫০ ধারা অনুযায়ী, অভিযোগের ভিত্তিতে ম্যাজিস্ট্রেট বাদীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না করলে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের কারাদণ্ড হতে পারে।
এ ছাড়া, ফৌজদারী কার্যবিধির ২০৫(৫) ধারায় ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা তিন হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৯৫ ধারার আওতায় ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে নিজেই বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন অথবা অভিযোগ গ্রহণ করে তা প্রধান বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠাতে পারেন।
মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। দণ্ডবিধির ১৯৩ ধারায় মিথ্যা সাক্ষ্যদানের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। আর সেই মিথ্যা সাক্ষ্যের কারণে যদি কোনো নিরপরাধ আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে দণ্ডবিধির ১৯৪ ধারা অনুযায়ী সাক্ষ্যদানকারীও মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন। অন্যদিকে, মিথ্যা মামলার লক্ষ্য যদি ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু হয়, তাহলে শিশু আইন, ২০১৩-এর ৮৩ ধারা অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬-এর ৯(ক) ধারা অনুযায়ী, মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা যেতে পারে। একইভাবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় যৌতুক বা ধর্ষণের মতো অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে আইনটির ১৭ ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, মিথ্যা মামলার প্রভাব কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তির জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজ এবং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ওপরও গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মিথ্যা মামলা শুধু একজন ব্যক্তিকে হয়রানির মুখে ঠেলে দেয় না, এটি ন্যায়বিচারের ভিত্তিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তাই আইনে একদিকে যেমন নিরপরাধ ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এসব বিধান যথাযথভাবে প্রয়োগ হলে মিথ্যা মামলার প্রবণতা কমার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।

