গ্রামবাসীর তথ্যেই ঠেকছে পুশ-ইন, সীমান্তে বাড়ছে দুই দেশের টানাপোড়েন:
সীমান্তে নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাই অনেক ক্ষেত্রে পুশ-ইন ঠেকাতে বড় ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা সময়মতো তথ্য না দিলে অনেক ঘটনাই নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ত।
গত মে মাসের শেষ দিকে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সীমান্তসংলগ্ন ভারতের অংশে কয়েকশ মানুষের জড়ো হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে। এরপর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ায় বিজিবি। পরবর্তী সময়ে ঝিনাইদহ, যশোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলার সীমান্তে একাধিক পুশ-ইন প্রচেষ্টা ঠেকানো হয় বলে জানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
বিজিবির ভাষ্য, এসব ঘটনায় বিএসএফের কার্যক্রমে একটি নির্দিষ্ট ধরণের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। সীমান্ত দিয়ে মানুষ প্রবেশ করানোর আগে কিছু সংকেত বা প্রস্তুতির লক্ষণ পাওয়া যায়। সেই তথ্য স্থানীয় বাসিন্দা, গোয়েন্দা সূত্র ও নিজেদের নজরদারির মাধ্যমে সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নেয় বিজিবি। বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, সীমান্তবর্তী গ্রামের মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অনেক কঠিন। স্থানীয়রা টহল ও নজরদারিতে সহায়তা করায় আগেভাগে সতর্ক হওয়া সম্ভব হচ্ছে।
দিল্লির বৈঠকেও আলোচনায় পুশ-ইন:
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও পুশ-ইনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত দুই বাহিনীর ৫৭তম সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশি নাগরিকসহ অবৈধ বিদেশিদের বিষয়ে দেশটির আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভারত দাবি করে, নিজস্ব আইন এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অবৈধভাবে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পুশ-ইনের বৈধতা নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, নাগরিকত্ব নিশ্চিত না করে কাউকে একতরফাভাবে সীমান্ত পার করে দেওয়া মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থী।
বাংলাদেশের অবস্থান হলো, ভারতসহ যেকোনো দেশ থেকে কোনো ব্যক্তিকে ফেরত নেওয়ার আগে তার নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এরপর কূটনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে হবে। রাতের অন্ধকারে বা জোরপূর্বক সীমান্তের ভেতরে মানুষ ঠেলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে সাম্প্রতিক পুশ-ইন পরিস্থিতির পেছনে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) নিয়েও তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রভাব রয়েছে। ২০১৯ সালে সংশোধিত এই আইন ২০২৪ সালে কার্যকর করা হয়। এতে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নথিহীন অমুসলিম অভিবাসীদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট কিছু নথি জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি তাদের নাগরিকত্ব আবেদন যাচাইয়ের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নাগরিকত্ব আবেদন যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পর যারা সিএএর আওতায় পড়বেন না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। এরপর থেকেই সীমান্তে পুশ-ইন নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশ সরকার বলছে, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা সতর্ক রয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া তাকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। গত ২৬ জুন এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সীমান্তে পুশ-ইন ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যেসব স্থানে এ ধরনের চেষ্টা হচ্ছে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি জানান, কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হলে তার তালিকা কূটনৈতিক মাধ্যমে ভারতকে দিতে বলা হয়েছে। এরপর নাগরিকত্ব যাচাই করে আইনগত প্রক্রিয়ায় তাদের ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, কিছু ভারতীয় নাগরিকও এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাদের পরিচয় যাচাই করে আদালতের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সব সময় এক রকম থাকে না। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর রাজ্য সরকারের কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকতে পারে। তবে কাউকে জোর করে সীমান্ত পার করে দেওয়া কোনো গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নয়। সীমান্তে পুশ-ইন নিয়ে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, নাগরিকত্ব যাচাই এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান।



