রাষ্ট্রপতি পদে কে আসছেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা নতুন নয়। এবার সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে চুক্তিতে নিয়োজিত একজন শীর্ষ আমলার নাম। বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন চলছে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে ওই আমলাকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন—চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা এই শীর্ষ আমলা কি আদৌ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখেন? সংবিধান ও নির্বাচনী আইনের ব্যাখ্যা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করে সংবিধান:
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের ৪৮(৪)(খ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা না রাখেন।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রথম শর্তগুলোর একটি হলো—প্রার্থীকে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হতে হবে। এখন আলোচনায় থাকা ওই শীর্ষ আমলা সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য কি না, সেটিই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে আইনি বাধা:
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর ১২(এইচ) ধারায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের বা কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর কেউ যদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান, তাহলে ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া বা চুক্তি বাতিলের পর তিন বছর না পেরোনো পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য হবেন না।
বর্তমানে আলোচিত ওই আমলা চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে তিনি এখনই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন কি না, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি তিনি যদি এখন দায়িত্ব ছাড়েন, তবুও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে নির্ধারিত সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এ ছাড়া আরপিওর ১২(এফ) ধারাতেও বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসরের পর তিন বছর অতিবাহিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন। ফলে রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় থাকলেও আইনগত বাধা কাটাতে ওই আমলাকে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে মত রয়েছে।
তাহলে সম্ভাব্য প্রার্থী কে?
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যদি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন, তাহলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং আবদুল মঈন খান। তবে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, শেষ মুহূর্তে দলটি নতুন কোনো চমকও দিতে পারে।
অতীতেও এসেছে চমক:
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হঠাৎ চমকের নজির রয়েছে। ২০০২ সালে অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তৎকালীন বিএনপি সরকার অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করেছিল। সেই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত।
এরপর ২০২৩ সালের এপ্রিলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আলোচিত কয়েকজন নেতাকে বাদ দিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চমক সৃষ্টি করেছিল। তাই এবারও রাষ্ট্রপতি পদে শেষ সিদ্ধান্ত কী হবে, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে আলোচিত শীর্ষ আমলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি সংবিধান ও নির্বাচনী আইনের বাধাগুলোও বড় বিবেচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

