জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট)। সংক্ষিপ্ত পরিসরের এই অধিবেশনে সংসদীয় কমিটিগুলো গঠন এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিল নিয়ে কাজ করাকেই অগ্রাধিকার দিতে চায় সরকার। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সদস্যদের নাম পাওয়ার পর দ্রুত সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছেন সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, অধিবেশনটি ৫, ৭ অথবা ১০ দিন চলতে পারে। তবে সংসদীয় কাজের প্রয়োজন অনুযায়ী অধিবেশনের সময় বাড়ানো হতে পারে।
ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিলের প্রস্তুতি
চিফ হুইপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় অধিবেশনে প্রায় ৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম এবং মানবাধিকার সুরক্ষাসংক্রান্ত বিল বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, বাবা-মা জীবিত অবস্থায় সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিলেও সম্পত্তিটির ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার তাঁদের কাছে থাকবে। এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলার সুযোগ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের কমিটি
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংশোধনের বিষয়টিও তৃতীয় অধিবেশনের অন্যতম আলোচ্য হতে পারে। চিফ হুইপ বলেন, সংবিধানের একটি কমা, দাঁড়ি কিংবা অর্ধচ্ছেদের পরিবর্তনও সংবিধান সংস্কারের অংশ।
তিনি জানান, সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এতে বিএনপি থেকে ৭ জন এবং জামায়াত থেকে ৫ জন সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ছোট দলগুলোর পক্ষ থেকেও একজন করে সদস্য রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বিরোধী দল তাদের প্রতিনিধিদের নাম দিলে তাঁদেরও কমিটিতে যুক্ত করা হবে।
চিফ হুইপের ভাষ্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবিধান সংশোধন অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের সংবিধান গত ৭৬ বছরে ১০৬ বার সংশোধনের কথা উল্লেখ করেন।
সংসদের ভেতরেই বিরোধী দলের ভূমিকা চান
বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও নিজের প্রত্যাশার কথা জানান চিফ হুইপ। তাঁর মতে, সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের দাবি জানানো বিরোধী দলের অন্যতম দায়িত্ব।
তিনি আশা করেন, বিরোধী দল সংসদের বাইরে অস্থিরতা তৈরির পরিবর্তে জনগণের সমস্যা সংসদে তুলে ধরবে। আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ও জাতীয় সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজা হবে।
চিফ হুইপ বলেন, ১৭ বছর ধরে জেল, গুম ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যে অর্জন এসেছে, তা যেন আবার কোনোভাবে নষ্ট না হয়। তাঁর প্রত্যাশা, বিরোধী দল সংসদে এসে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধানের পথ তৈরি করবে।
ছয় মাসে সব সংকটের সমাধান সম্ভব নয়
বর্তমান সরকারের মেয়াদ মাত্র ছয় মাস হওয়ায় দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানে সময় লাগবে বলেও মন্তব্য করেন চিফ হুইপ।
বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সবকিছু অনুকূলে থাকলেও একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগে। ফলে মাত্র ছয় মাসে দীর্ঘদিনের সব সংকটের সমাধান প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
তাঁর মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ বড় অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সময় প্রয়োজন। এ কারণে জনগণকে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি দেশের স্বার্থে সবাইকে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে ক্ষোভ
বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন চুক্তি নিয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ খাতে এমন কিছু চুক্তি করা হয়েছে, যা দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, দায়মুক্তির ব্যবস্থা রেখে আইন প্রণয়নের কারণে এসব চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগও সীমিত করা হয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও সক্ষমতা বাবদ অর্থ পরিশোধের কারণে জনগণের অর্থের ওপর বড় চাপ পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ভারতের আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে করা বিদ্যুৎ চুক্তিকে ‘গর্হিত অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে চিফ হুইপ বলেন, এর ফলে বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির ওপর তৈরি হওয়া এ চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে তৃতীয় অধিবেশনকে দীর্ঘ বিতর্কের চেয়ে সংসদীয় কার্যক্রমকে কাঠামোবদ্ধ ও কার্যকর করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন চিফ হুইপ। কমিটি গঠন, গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন এবং বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ—এই চারটি ক্ষেত্রেই আগামী অধিবেশনে সংসদের কার্যকারিতা কতটা বাড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

