রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রস্তুত করা এ অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া নতুন ধাপে প্রবেশ করল।
সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা পৌনে ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে।
অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম এবং মার্জিনা রায়হান উপস্থিত ছিলেন। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত সংস্থা দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে তদন্ত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেয়। পরে আইনি যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আদালতে দাখিল করা হয়েছে।
মামলায় আসামি করা হয়েছে মোট ৪১ জনকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী।
এ ছাড়া মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের সাবেক আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাংবাদিক ফারজানা রূপা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক ও তৎকালীন একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকেও এ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার, একেএম শহীদুল হক, ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন ও মনিরুল ইসলামসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ দেশের চারটি স্থানে সংঘটিত সহিংসতায় মোট ৫৮ জন নিহত হন। তদন্ত সংস্থা নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করেছে বলে জানিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হন। মামলার পরবর্তী ধাপে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র গ্রহণ, শুনানি এবং অভিযোগ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আদালতের পরবর্তী আদেশের ওপর নির্ভর করবে বিচার কার্যক্রমের পরবর্তী অগ্রগতি।

