বাংলাদেশের সংবিধানে দায়িত্ব পালনরত রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ফৌজদারি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ না থাকলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলা দায়ের এবং আদালতের মাধ্যমে সেটি আমলে নেওয়ার ঘটনা নতুন করে আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মামলাটি দায়েরের প্রায় ১০ মাস পর বিষয়টি জনসমক্ষে আসার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে—সংবিধানের সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও এমন মামলা কীভাবে গ্রহণ করা হলো এবং তদন্তের নির্দেশই বা কীভাবে দেওয়া হলো।
মামলাটি দায়ের করা হয় ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে। একই দিন আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে অভিযোগটি আমলে নেন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কয়েক দফা পেছালেও এখন পর্যন্ত দুদক আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। সর্বশেষ আদালত আগামী ১১ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
ঘটনাটি আলোচনায় আসার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়মুক্তির বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের ২ নম্বর দফা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো ধরনের ফৌজদারি কার্যধারা শুরু বা চালিয়ে নেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার বা কারাবাসের উদ্দেশ্যে কোনো পরোয়ানাও জারি করা যাবে না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, দায়িত্ব পালনরত রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা গ্রহণ এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া সংবিধানের বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের মামলা কীভাবে আদালতে গ্রহণযোগ্য হলো, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন এবং বিষয়টি বিচারব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকেও পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তবে বিষয়টি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে আইনমন্ত্রী মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পক্ষে ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. আবদুচ ছামাদ বাদী হয়ে অভিযোগটি দায়ের করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে ‘ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড’-এর নামে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি, প্রতারণা এবং অবৈধভাবে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এই মামলায় মোট ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নামও রয়েছে। মামলার নথিতে তাঁর পরিচয় দেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক হিসেবে। এছাড়া মামলায় ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড, এস আলম গ্রুপ এবং ইসলামী ব্যাংকের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান পরিচালকের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আদালতের কার্যক্রম অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ মামলাটি গ্রহণ করে দুদককে তদন্তের নির্দেশ দেন এবং একই বছরের ৫ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়ায় একাধিকবার সময় বাড়ানো হয়।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত সূত্র জানিয়েছে, সর্বশেষ গত ২৩ জুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য ছিল। সেদিনও প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীরের আদালত আগামী ১১ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
এদিকে আদালতের রেকর্ডরুমের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মামলার নথিতে আসামির পরিচয় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যাতে তিনি রাষ্ট্রপতি—এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। তাঁর দাবি, আসামির নাম থাকলেও কোনো সরকারি পদবি বা দায়িত্বের উল্লেখ না থাকায় আদালত কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষে বিষয়টি তখন শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, যদি মামলার ১২ নম্বর আসামিই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর পরিচয় যথাযথভাবে উল্লেখ না করায় আদালত বিভ্রান্ত হয়েছে। পাশাপাশি মামলার ঘটনার সময়, ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্যের সঙ্গেও রাষ্ট্রপতির সরকারি পরিচয়ের মিল পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বাদীপক্ষের প্যানেল আইনজীবী আব্দুল কুদ্দুস বলেছেন, মামলার নথিতে উল্লেখিত মো. সাহাবুদ্দিনই তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কোনো তথ্য নেই। তিনি জানান, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে আসামির তালিকা সরবরাহ করেছে, তার ভিত্তিতেই তিনি মামলাটি আদালতে দাখিল করেছেন।
আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিষয়টি এখন শুধু একটি দুর্নীতির মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সংবিধানের ব্যাখ্যা, রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় তথ্য উপস্থাপনের স্বচ্ছতা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পাশাপাশি আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজন হলে উচ্চ আদালতের ব্যাখ্যাও এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ আইনি দৃষ্টান্ত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

