বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এখন প্রায় ৪৫ লাখ। একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে কোথাও কয়েক বছর, কোথাও এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যায়। বিচারপ্রার্থীদের জন্য এটি যেমন সময় ও অর্থের বড় বোঝা, তেমনি বিচারব্যবস্থার জন্যও এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট। এই বাস্তবতায় আদালতের দরজায় পৌঁছানোর আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির একটি বিকল্প পথকে আরও বিস্তৃত করছে সরকার।
সেই লক্ষ্যেই দেশের আরও ১০টি জেলায় বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব (Pre-Case) মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালু হয়েছে। সরকারের আশা, আদালতে মামলা দায়েরের আগেই যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিরোধ মীমাংসা করা যায়, তাহলে একদিকে যেমন নতুন মামলার চাপ কমবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও দ্রুত ও কম খরচে আইনি প্রতিকার পাবেন।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই ২০২৬) আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চ্যুয়ালি এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দেখাতে শুরু করেছে। তাঁর ভাষায়, এই উদ্যোগ বিচারপ্রার্থীদের জন্য দ্রুত ও সহজে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করছে এবং আদালতে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনছে। কার্যক্রমটি আরও বিস্তৃত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের দীর্ঘদিনের মামলাজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কোন জেলাগুলো যুক্ত হলো?
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ২১খ অনুযায়ী নতুন করে বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল জেলায় এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
এর ফলে এসব জেলায় নির্ধারিত সাতটি আইনের আওতায় কোনো মামলা আদালতে দায়ের করার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে বিনামূল্যে মধ্যস্থতার সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ, আদালতে যাওয়ার আগে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি বাধ্যতামূলক ধাপ যুক্ত হলো।
সরকারের দাবি: মামলা কমেছে ৬২ শতাংশ
সরকারের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আগে চালু হওয়া ২০টি জেলার পাইলট প্রকল্প ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর অধীনে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা গড়ে ৬২.০২ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করা হয়েছে। আইনভিত্তিক পরিসংখ্যানেও একই প্রবণতা দেখা গেছে—
- পারিবারিক আদালত আইনে মামলা ৩,৫৫৯ থেকে কমে ১,৭৪৪টিতে নেমেছে।
- বণ্টন সংক্রান্ত মামলা ২,০০১ থেকে কমে ৬৬১টিতে এসেছে।
- স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রিম্পশন সংক্রান্ত মামলা ১৭ থেকে মাত্র ২টিতে নেমে এসেছে।
- যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা ৫,৬০৫ থেকে কমে ১,৮১০টিতে দাঁড়িয়েছে।
- নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইন এবং পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনেও নতুন মামলা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
যদিও এসব পরিসংখ্যান সরকারের উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা স্থায়ী হয় কি না, সেটিই হবে উদ্যোগটির প্রকৃত কার্যকারিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
কক্সবাজারে বিশেষ নজর
অনুষ্ঠানে কক্সবাজার জেলার বিচারিক পরিস্থিতির বিষয়টি আলাদাভাবে তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, জেলাটিতে বর্তমানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট জেলা জজ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং আইনজীবীদের আগামী তিন মাসের মধ্যে দৃশ্যমানভাবে মামলাজট কমানোর উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি নিজেই অগ্রগতি মূল্যায়ন করবেন বলেও জানান।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা
মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, এই দায়িত্বকে কেবল চাকরি হিসেবে নয়, বরং জনসেবামূলক দায়িত্ব হিসেবে পালন করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে পরিচালিত মধ্যস্থতা কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুর হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা।
এ ছাড়া ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন যশোরের জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খাতুন, কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ নোমান, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য জাইকা (JICA), জিআইজেড (GIZ) এবং ইউএনডিপি (UNDP)-এর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
আদালতের চাপ কমানোর কার্যকর উপায় নাকি শুধু পরিসংখ্যানের সাফল্য?
বিশ্বের অনেক দেশেই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (Alternative Dispute Resolution বা ADR) আদালতের ওপর চাপ কমানোর একটি কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশেও সেই ধারণাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
তবে কেবল নতুন মামলা কমে যাওয়াই এই উদ্যোগের সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড নয়। মধ্যস্থতায় সম্পাদিত সমঝোতা কতটা টেকসই হচ্ছে, পক্ষগুলো কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছে, দুর্বল বা প্রান্তিক পক্ষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকছে এবং ব্যর্থ মধ্যস্থতার পর আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো অযৌক্তিক বিলম্ব তৈরি হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ মধ্যস্থতাকারী, কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে এই ব্যবস্থা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল আদালতে যাওয়ার আগে আরেকটি আনুষ্ঠানিক ধাপে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যাবে।

