টানা ১৬ ঘণ্টা ডিউটি শেষে ভোরের আলো ফুটতেই যখন শহর সচল হতে শুরু করে, ঠিক তখনই প্লাস্টিকের চেয়ার ছেড়ে নামেন একজন পাহারাদার। ব্যাংকের ভল্ট, এটিএম বুথ কিংবা দামি করপোরেট ভবনের কোটি কোটি টাকার সম্পদ সারারাত পাহারা দিয়ে যিনি ঘরে ফেরেন, মাস শেষে তাঁর হাতে ওঠে মাত্র সাড়ে আট থেকে নয় হাজার টাকা। শ্রমের এই চরম বৈষম্যের চিত্র সামনে এনে সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে দেশের বিশাল বেসরকারি নিরাপত্তা খাত।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি পুলিশ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা যেখানে প্রায় দুই লাখের কিছু বেশি, সেখানে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ—যা পুলিশ বাহিনীর তুলনায় প্রায় তিন গুণ। শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশেই এখন পুলিশের চেয়ে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বেশি। নিরাপত্তা এখন আর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাজারে কেনাবেচা হওয়া একটি সেবায় পরিণত হয়েছে।
‘ফাটল ধরা কর্মক্ষেত্র’ সৃষ্টি এবং দায় এড়ানোর এক বিশাল কাঠামো যেন প্রতিটি সিকিউরিটি এজেন্সি।
অর্থনীতিবিদ ডেভিড ওয়াইলের ভাষায়, এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ফিসার্ড ওয়ার্কপ্লেস’ (Fissured Workplace) বা ‘ফাটল ধরা কর্মক্ষেত্র’। ব্যাংক বা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ না দিয়ে এজেন্সির মাধ্যমে আউটসোর্সিং করে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো প্রত্যক্ষ আইনি দায়বদ্ধতা থাকে না, আর এজেন্সিগুলোর লক্ষ্য থাকে সর্বনিম্ন ব্যয়ে সেবা প্রদান। এই দুইয়ের চাপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা।
ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং এই শ্রেণির কর্মীদের ‘প্রিকারিয়াট’ (Precariat) বা অনিশ্চয়তার শ্রমিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের কাজ আছে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা নেই; শ্রম আছে, কিন্তু নেই পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা কিংবা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।
বঞ্চনা, জরিমানা ও আইনি দুর্বলতার কারণে প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এই খাতের প্রায় ৯৫ শতাংশ কর্মী।
একদিকে নামমাত্র মজুরি, অন্যদিকে চাকরির শুরুতেই তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ ফি দিতে হয়। আবার ডিউটির সময় সামান্য ঝিমুনির অভিযোগে মূল বেতনের অর্ধেক পর্যন্ত কেটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ২০২১ সালে নিম্নতম মজুরি বোর্ড বেসরকারি নিরাপত্তা খাতের সর্বনিম্ন গ্রেডের গার্ডদের জন্য ৯ হাজার ১৪০ টাকা ন্যূনতম মজুরির একটি খসড়া সুপারিশ করলেও আজ পর্যন্ত তা গেজেট আকারে প্রকাশ হয়নি।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে অন্তর্বর্তী সরকার আউটসোর্সিং নীতিমালার আওতায় সরকারি খাতে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মীদের মাসিক পারিশ্রমিক ১৮ হাজার ১৮০ টাকা নির্ধারণ করলেও বেসরকারি খাতের প্রায় ছয় লাখ কর্মী সেই সুবিধা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত রয়েছেন।
সবচেয়ে ভয়ংকর ও অমানবিক বাস্তবতা হলো, বেসরকারি নিরাপত্তা খাতের একজন শ্রমিকের জীবনের আইনি মূল্য মাত্র দুই লাখ টাকা।
২০১৯ সালে গাজীপুরে একটি এটিএম বুথে দায়িত্ব পালনকালে এক নিরাপত্তাকর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। কোটি কোটি টাকার সম্পদ পাহারা দেওয়া এসব মানুষের জীবনের ক্ষতিপূরণ শ্রম আইন অনুযায়ী মাত্র দুই লাখ টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজবিজ্ঞানী ইওহান গালতুংয়ের ভাষায় এই ব্যবস্থা এক ধরনের ‘কাঠামোগত সহিংসতা’ (Structural Violence)। বেসরকারি নিরাপত্তা খাত সেবা ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও গ্রাহক যে মূল্য পরিশোধ করেন এবং শ্রমিক যে পারিশ্রমিক পান, তার মধ্যে অস্বাভাবিক বৈষম্য এবং পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষার অভাবই এখন এই খাতের সবচেয়ে বড় সংকট।
এ সংকট নিরসনে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে আইনপ্রণেতারা দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিলে দেশের শ্রমবাজারের একটি বৃহৎ অংশের বঞ্চনা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
- মিজান মাজনুন,
আইনজীবী ও সাংবাদিক

