ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার বহুল প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা শুরু হয়েছে হাইকোর্টে। নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ আসামির সাজা বহাল থাকবে কি না, নাকি মামলার রায়ে কোনো পরিবর্তন আসবে—আজকের রায়ে তারই নিষ্পত্তি হওয়ার কথা।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রায় ঘোষণা শুরু হয়।
আদালতে আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির উপস্থিত রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষে রয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।
কী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন, আসামিদের করা আপিল এবং কারাগার থেকে করা আপিল—এই তিন ধরনের আবেদনের ওপর হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত আসছে। গত ২০ আগস্ট এসব আবেদনের শুনানি শেষ হয়।
এর আগে রাষ্ট্রপক্ষ মামলার নথিপত্রের ভিত্তিতে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করে। দীর্ঘ শুনানিতে মামলার সাক্ষ্য, আলামত, আসামিদের ভূমিকা এবং নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের আইনগত ভিত্তি নিয়ে যুক্তি তুলে ধরা হয়।
যে ঘটনার পর দেশজুড়ে আলোড়ন
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় ৬ এপ্রিল নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকার বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হলে ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড
মামলার বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রায় দেন। রায়ে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—সিরাজ উদদৌলা, রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান, মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
হাইকোর্টে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই রায়
নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে তা হাইকোর্টে অনুমোদিত হতে হয়। ফলে নুসরাত হত্যা মামলার আজকের রায় শুধু আসামিদের আপিলের নিষ্পত্তিই নয়, নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের বিচারিক পর্যালোচনারও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ডের রায়সহ মামলার নথিপত্র হাইকোর্টে পৌঁছায়। পরে তা ১৪০/১৯ নম্বর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়। মামলাটি চাঞ্চল্যকর হওয়ায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়। একই সঙ্গে আসামিরা পৃথকভাবে আপিল ও কারাগার থেকে আপিল করেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন, আপিল ও অন্যান্য বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি গত ১০ জুন এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে।
নুসরাত হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাত বছর পর হাইকোর্টে এসে মামলাটি এখন রায়ের দ্বারপ্রান্তে। নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, নাকি আসামিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাজা বা রায়ে পরিবর্তন আসে—হাইকোর্টের সিদ্ধান্তেই এখন সেদিকে নজর সবার।

