দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মহাস্থানগড় নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড় এসেছে। বগুড়ার এই ঐতিহাসিক এলাকায় যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজের ওপর স্থিতাবস্থা বহাল রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত। একই সঙ্গে ২০১২ সালে হাইকোর্টের দেওয়া সংরক্ষণ-সংক্রান্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতিও দিয়েছেন আদালত।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের একটি বেঞ্চ আজ এই আদেশ দেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত সরকারের আপিলের অনুমতির আবেদন মঞ্জুর করার পাশাপাশি মহাস্থানগড়ের সীমানার মধ্যে সব ধরনের নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রায় দেড় দশক আগে মহাস্থানগড়ের সীমানার ভেতরে তৎকালীন একটি মাজার কমিটি মসজিদ নির্মাণসহ নানা উন্নয়নকাজ শুরু করলে বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরপর একটি মানবাধিকার সংগঠন জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মহাস্থানগড় সংরক্ষণের দাবি জানায়।
সেই রিটের ভিত্তিতে হাইকোর্ট একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে মহাস্থানগড় সংরক্ষণ নিয়ে প্রতিবেদন চান। কমিটি সুপারিশ করে, প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার বাইরে, মহাস্থানগড়ের পূর্ব পাশে একটি মসজিদ নির্মাণ করা যেতে পারে। এর ভিত্তিতে ২০১২ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট মহাস্থানগড়ের সীমানার মধ্যে যেকোনো উন্নয়নমূলক নির্মাণকাজে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
রিটকারীর পক্ষের একজন আইনজীবীর ভাষ্যমতে, সেই রায়ের পর প্রায় পনেরো বছর ধরে মহাস্থানগড়ে নতুন কোনো নির্মাণকাজ হয়নি। তবে সম্প্রতি স্থানীয় একজন মন্ত্রীর বরাদ্দ করা প্রায় তিয়াত্তর লাখ টাকা দিয়ে একটি রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু হলে জেলা প্রশাসন তা বন্ধ করে দেয়। এই ঘটনার পরই সরকার হাইকোর্টের পুরোনো রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
আদালতে সরকারের পক্ষে দায়িত্বে থাকা অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মহাস্থানগড়ে আগত দর্শনার্থী নারীদের জন্য নামাজের স্থান এবং ওয়াশরুমের মতো প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু হাইকোর্টের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব প্রয়োজনীয় স্থাপনাও নির্মাণ করা যাচ্ছে না বলে তিনি রায় সংশোধনের আবেদন জানান।
এর বিপরীতে রিটকারীর পক্ষে থাকা একজন সিনিয়র আইনজীবী যুক্তি দেন, মহাস্থানগড় শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ইতিমধ্যে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রাথমিক তালিকায় স্থান পেয়েছে। তাঁর মতে, এই এলাকায় কোনো ধরনের নির্মাণকাজ হলে ভবিষ্যতে চূড়ান্ত বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই তিনি সরকারের আপিলের অনুমতি দেওয়া হলেও একই সঙ্গে সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার আবেদন জানান আদালতের কাছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সরকারের এই আপিলের বিরুদ্ধে খোদ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা নিজেই আপত্তি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তার কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যায়, সরকারের অভ্যন্তরেই এই ইস্যুতে দ্বিমত রয়েছে।
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আপিল বিভাগ সরকারের আপিল দায়েরের অনুমতি মঞ্জুর করলেও একই সঙ্গে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মহাস্থানগড় এলাকায় যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজে অস্থায়ী স্থিতাবস্থা জারি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে চূড়ান্ত আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক এলাকায় নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ থাকছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আদেশ একদিকে যেমন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের পক্ষে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় প্রশাসনিক চাহিদা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্নটিও নতুন করে সামনে এনেছে। মামলার চূড়ান্ত ফলাফল মহাস্থানগড়ের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও সম্ভাব্য ইউনেস্কো স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

