যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার সীমিত করতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার তাঁর লক্ষ্য তথাকথিত ‘জন্ম পর্যটন’ অর্থাৎ, সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা।
তবে ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশও বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন আইন ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুর নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন পদক্ষেপের বড় একটি অংশ টেকা কঠিন।
গত বৃহস্পতিবার দুটি নির্বাহী আদেশে সই করেন ট্রাম্প। এর একটি আদেশে এমন শিশুর নাগরিকত্ব স্বীকৃতি না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার বাবা বা মা নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। আরেকটি আদেশে ‘জন্ম পর্যটন’-এর উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে পারেন, এমন বিদেশিদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার পথ তৈরি করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম উদ্যোগটিই সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বিষয়ে গবেষক আমান্ডা ফ্রস্ট বলেন, ‘এই শিশুরা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়ার কারণেই নাগরিক। তাদের বাবা-মায়ের কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ড সন্তানের নাগরিকত্বের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে না।’
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নতুন উদ্যোগ
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার একটি বিস্তৃত নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। এতে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাময়িকভাবে বৈধভাবে অবস্থানরত অভিবাসী, যেমন কর্মী বা শিক্ষার্থীদের সন্তানদের নাগরিকত্ব নিয়েও বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু ৩০ জুন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের সেই নীতি বাতিল করে দেয়। ‘ট্রাম্প বনাম বারবারা’ মামলায় আদালত বলেন, ওই নীতি মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই সংশোধনী অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং দেশটির আইনগত কর্তৃত্বের আওতাধীন ব্যক্তিরা নাগরিকত্বের অধিকারী।
ছয় বিচারপতির সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের বিপরীতে তিন বিচারপতি ভিন্নমত দেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের পক্ষে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস লিখেছিলেন, ১৪তম সংশোধনীর প্রণেতারা যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া স্বাধীন ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, নাগরিকত্ব হলো অধিকার ভোগ ও রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে স্বাধীনভাবে অংশ নেওয়ার অধিকার।
তবে ভিন্নমত দেওয়া বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আদালতের রায়ের ফলে এমন শিশুও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবে, যার মা কেবল সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে অল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন।
আলিটোর মতে, এর ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে বৈধভাবে অভিবাসনের জন্য বিদেশিদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে, অথচ ‘জন্ম পর্যটক’-এর সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নাগরিকত্ব পেয়ে যাবে।
‘জন্ম পর্যটন’ নিয়ে ট্রাম্পের অভিযোগ
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁর অভিবাসন নীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আরও কঠোর করা।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে নতুন আদেশে সই করার সময়ও তিনি সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে ‘জন্ম পর্যটন’কে কেন্দ্র করে একটি ব্যবসা গড়ে উঠেছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ এর সুবিধা নিচ্ছেন।
তবে বিভিন্ন গবেষণায় ট্রাম্পের দাবির তুলনায় অনেক কম সংখ্যার কথা উঠে এসেছে। পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার শিশু যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছে, যাদের মায়েরা মূলত জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন।
নতুন আদেশে ভিসা নিয়েও বিধিনিষেধ
ট্রাম্পের দ্বিতীয় নির্বাহী আদেশে ‘জন্ম পর্যটন’-এর উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে পারেন; এমন বিদেশিদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে।
তবে এটি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসন বিধিতেই নবজাতকের নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে অস্থায়ী ভিসা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আদেশে কর্মকর্তাদের হাতে ব্যাপক বিবেচনাধিকার তৈরি হতে পারে। কারও যুক্তরাষ্ট্রে আসার ‘উদ্দেশ্য’ কী ছিল, কিংবা তিনি জন্ম পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত কি না, এসব নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লস অ্যাঞ্জেলেস শাখার অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ হিরোশি মোটোমুরা বলেন, নতুন ব্যবস্থার কিছু শব্দ ও ধারণার সুনির্দিষ্ট সীমা নেই। ফলে কর্মকর্তাদের হাতে ভিসা দেওয়া, প্রবেশের অনুমতি কিংবা অতিরিক্ত যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষমতা চলে যেতে পারে।
কূটনীতিকদের বাইরে নতুন ব্যতিক্রম?
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে ঐতিহাসিকভাবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখলকারী শত্রু দেশের সেনাদের সন্তানদের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
ট্রাম্পের নতুন আদেশে এই ব্যতিক্রমের পরিধি আরও বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে বিদেশি সরকারের কর্মী এবং বিদেশি সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদেরও এই ব্যতিক্রমের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এই অংশটি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ফ্রস্ট মনে করেন, কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের পরিধি বাড়ানো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনসম্মত হতে পারে। তবে তার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মার্কিন আইনের আওতায় উল্লেখযোগ্য ধরনের দায়মুক্তি থাকতে হবে।
অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনে বিচার বিভাগে কাজ করা ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলি শাখার আইন অধ্যাপক জন ইউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে থাকা বিদেশি শত্রু বাহিনীর সংজ্ঞার মধ্যে সন্ত্রাসী সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক বৈধতা পেতে পারে।
তবে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক স্যাম এরম্যান এ ধরনের বিস্তৃত ব্যাখ্যার ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত জাপানি অভিবাসীদের ‘শত্রু বিদেশি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ব্যাখ্যা প্রয়োগ করা হলে একই ধরনের পরিস্থিতিতে তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের নাগরিকত্বও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারত।
আদালতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশের প্রতিটি অংশ আদালতে আলাদাভাবে পরীক্ষা হতে পারে। বিশেষ করে বাবা-মায়ের প্রতারণা বা অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের কারণে তাদের সন্তানকে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার উদ্যোগটি বড় সাংবিধানিক পরীক্ষার মুখে পড়বে।
বুশ প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা জন ইউও মনে করেন, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে এমন কোনো ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়নি, যার মাধ্যমে বাবা-মায়ের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা যায়।
নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন আইন বিভাগের অধ্যাপক র্যাচেল রোজেনব্লুম আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, নতুন আদেশের কিছু ব্যতিক্রম আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
তিনি বলেন, আদেশের এসব নতুন ব্যতিক্রম স্পষ্টতই অসাংবিধানিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের পরাজয়ের পরও সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এটি অনেকটা মরিয়া পদক্ষেপের মতো মনে হচ্ছে।
তবে হোয়াইট হাউস অবশ্য এই অভিযোগ মানছে না। হোয়াইট হাউসের স্টাফ সেক্রেটারি উইল শার্ফের দাবি, নতুন নির্বাহী আদেশে সুপ্রিম কোর্টের কোনো সিদ্ধান্তই লঙ্ঘন করা হয়নি।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন পদক্ষেপের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আদালতের ব্যাখ্যার ওপর। একদিকে প্রশাসন জন্ম পর্যটন ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের যুক্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুর নাগরিকত্বের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এভাবে নির্বাহী আদেশ দিয়ে সীমিত করা সহজ হবে না।

