সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা ছাড়া সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানো বা হয়রানি করা যাবে না, হাইকোর্টের দেওয়া এই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই আদেশ কেবল খায়রুল হকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে; অন্য কোনো মামলায় একই ধরনের গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে এর প্রভাব থাকবে না।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ আজ রোববার রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন ও লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে এ আদেশ দেন।
আদেশের ফলে খায়রুল হকের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর সুযোগ আপাতত থাকছে না। একই সঙ্গে হাইকোর্টে তাঁর করা মূল রিটের দ্রুত নিষ্পত্তির পথও খুলে গেল।
যে প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল
পৃথক মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পরও গত ৩০ মার্চ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানার দুটি হত্যা মামলায় খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এক মামলায় জামিন পাওয়ার পর অন্য মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন তাঁর ছেলে ও আইনজীবী আশিক উল হক।
এ নিয়ে গত ১৩ মে তিনি হাইকোর্টে রিট করেন।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ১৭ মে হাইকোর্ট রুল জারির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন। আদালত তখন সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখাতে এবং তাঁকে হয়রানি না করতে নির্দেশ দেন।
হাইকোর্টের এই আদেশ স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। একই সঙ্গে লিভ টু আপিলও করা হয়। চেম্বার আদালতের কার্যক্রম শেষে বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য আসে।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন কেন নিষ্পত্তি
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান চৌধুরী। তিনি পরে প্রথম আলোকে বলেন, খায়রুল হকের অসুস্থতাসহ কিছু পরিস্থিতি বিবেচনায় রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে হাইকোর্টে মূল রিটটি দ্রুত শুনানি করে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ও স্পষ্ট করেছেন আপিল বিভাগ। খায়রুল হকের ক্ষেত্রে ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ বিষয়ে দেওয়া এই আদেশ অন্য কোনো মামলার ক্ষেত্রে নজির হিসেবে প্রযোজ্য হবে না। কারণ, একই বিষয়ে এক মামলায় জামিনের পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বৈধতা নিয়ে; এরই মধ্যে অন্য একটি মামলায় আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করেছেন।
ফলে বর্তমান আদেশটি মূলত খায়রুল হকের মামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
অন্যদিকে খায়রুল হকের অন্যতম আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহীন বলেন, সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখাতে এবং হয়রানি না করতে হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছিলেন, আপিল বিভাগ তা বহাল রেখেছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রুল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জামিনের পরও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রশ্ন
খায়রুল হকের আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছয়টি মামলায় জামিন পাওয়ার পরও তাঁকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ধারাবাহিকতা থেকেই রিটটি করা হয়। হাইকোর্ট ১৭ মে আদেশ দেওয়ার পরও আরও তিনটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে খায়রুল হকের বিরুদ্ধে থাকা মামলার সংখ্যা এখন ৯টি। এর মধ্যে ৮টি মামলাতেই তিনি জামিনে আছেন।
এ কারণেই মামলাগুলোতে একের পর এক গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তিগতভাবে খায়রুল হকের ক্ষেত্রে নয়, একজন আসামি জামিন পাওয়ার পরও অন্য মামলায় তাঁর আটক থাকার আইনি সীমা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি থেকে একাধিক মামলার আসামি
এ বি এম খায়রুল হক ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন।
এর বহু বছর পর, গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদলকর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এরপর থেকে বিভিন্ন মামলায় তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বর্তমান আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে তাই শুধু তাঁর জামিনের বিষয়টি নয়; বরং একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর অন্য মামলায় তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া কতটা আইনসঙ্গত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আপিল বিভাগের আজকের আদেশে খায়রুল হকের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আপাতত বহাল থাকল। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি অবস্থান নির্ধারিত হবে হাইকোর্টে চলমান মূল রিটের নিষ্পত্তির পর।

