হিন্দু আইনে ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করার অধিকার নেই বলে গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ভাইয়ের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে দায়ের করা এক দেওয়ানি রিভিশন মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে এই রায় দিয়েছে আদালত, পাশাপাশি অধস্তন আদালতের আগের রায় ও ডিক্রিও বহাল রাখা হয়েছে।
বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৯ জুলাই এই রায় দেন, যার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে গত বুধবার। মামলাটির রায় লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি রাফিজুল ইসলাম।
মামলাটির শিকড় প্রোথিত রয়েছে প্রায় একশ বছর আগের এক জমি ক্রয়ে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা রামকান্ত বিশ্বাসের এক পুত্র ও তিন কন্যা ছিল। ১৯২০ সালে তিনি নিজের অর্থে ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের নামে পটিয়ায় সোয়া একরের বেশি জমি কেনেন। তবে বাবার জীবদ্দশাতেই ছেলে সতীশ চন্দ্র মারা যান, আর ১৯৩৩ সালে মারা যান রামকান্ত বিশ্বাস নিজেও।
এরপর রামকান্তের কন্যা শৌল বালা দাস উত্তরাধিকার সূত্রে জমিটির মালিকানা দাবি করেন। তবে ততদিনে সতীশ চন্দ্রের স্ত্রী সাবিত্রী বালা—যিনি তখনো জীবিত ছিলেন—১৯৯৬ সালে জমিটি বিক্রি করে দেন মনোরঞ্জন মহুরী নামের একজনের কাছে।
১৯৯৮ সালে পটিয়ার একটি আদালতে এই বিক্রয়ের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করেন শৌল বালা দাস, দাবি করেন বিক্রয় দলিলটি জাল ও প্রতারণামূলক। তবে সাক্ষ্যপ্রমাণ বিচার-বিশ্লেষণ শেষে ২০০০ সালে নিম্ন আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। এরপর জেলা জজ আদালতে করা আপিলও খারিজ হয়ে যায় ২০০৭ সালে। এই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে বাদীপক্ষ ২০০৮ সালে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন, যার প্রেক্ষিতে আদালত রুল জারি করেছিল।
দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর সেই রুলই খারিজ করে দিলেন হাইকোর্ট, ফলে নিম্ন আদালতের রায়ই চূড়ান্তভাবে বহাল থাকল।
রায়ে হাইকোর্ট হিন্দু দায়ভাগা আইনের আওতায় বিধবা নারীর সম্পত্তি অধিকারের বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তিতে জীবদ্দশায় একধরনের স্বত্ব লাভ করেন, তবে সেই সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষমতা সীমিত।
আদালত আরও ব্যাখ্যা করেন, বিধবা যদি এই সম্পত্তি অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করেন, তাহলে সেই হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার সবার নেই। কেবল তিনিই এই অধিকার রাখেন, যিনি বিধবার মৃত্যুর পর ওই সম্পত্তির প্রকৃত পরবর্তী উত্তরাধিকারী বা আইনি ভাষায় ‘রিভার্সনার’ হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
আদালতের ভাষায়, যাঁর সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে বর্তমানে বা ভবিষ্যতে কোনো আইনগত উত্তরাধিকার নেই, তিনি কেবল হস্তান্তরটি ‘আইনগত প্রয়োজনে’ হয়নি—এই যুক্তি দেখিয়ে আদালতে সেই হস্তান্তরকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না। এই মূলনীতির ভিত্তিতেই আদালত বাদীর দাবি খারিজযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দেন।
শুনানিতে রিভিশন আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সমীরণ দাস গুপ্ত, আর বিবাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী।

