বহুল আলোচিত মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় ঘোষণার দিন আরও এক দফা পিছিয়ে গেল। এই মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদনের জন্য করা ডেথ রেফারেন্স ও তার আপিলের ওপর রায়ের নতুন দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী সোমবার, ৩১ আগস্ট।
গতকাল মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে সময়ের আবেদন জানানো হলে সেই আবেদন মঞ্জুর করে নতুন এই তারিখ নির্ধারণ করেন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ। এই বেঞ্চে ছিলেন দুজন বিচারপতি। আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরপরই রাষ্ট্রপক্ষের একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান, এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে মূল শুনানি করেছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল নিজে, কিন্তু বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এই কারণ দেখিয়েই সময় চাওয়া হয়, আর আদালত তা মঞ্জুর করে রায়ের জন্য নতুন দিন নির্ধারণ করে দেন।
এর আগে গত সোমবার (২৪ আগস্ট) এই মামলার রায়ের জন্য মঙ্গলবার অর্থাৎ পঁচিশে আগস্ট দিন ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে সেই তারিখ আবার পরিবর্তন করতে হলো।
মামলার প্রেক্ষাপট বলছে, গত বছর রমজান মাসের ছুটিতে মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় নিজের বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল আট বছর বয়সী শিশু আছিয়া। সেখানেই গত বছরের পাঁচই মার্চ রাতে তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়। এই ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখ, যিনি শুধু ধর্ষণেই ক্ষান্ত থাকেননি, শিশুটিকে হত্যার চেষ্টাও চালান। পরবর্তীতে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার সময় ঢাকার একটি সামরিক হাসপাতালে মারা যায় শিশুটি।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ পরে অভিযুক্ত সবাইকে গ্রেপ্তার করে। তদন্ত শেষে গত বছরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়, আর এপ্রিলের শেষ দিকে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মামলার বিচারিক কার্যক্রম।
এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার পর মাত্র তেরো কার্যদিবসের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন মোট ঊনত্রিশ জন। যুক্তিতর্ক শেষে মামলার নিম্ন আদালত রায় ঘোষণা করেন।
সেই রায়ে প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। তবে বাকি তিন আসামিকে— যাদের মধ্যে ছিলেন নিহত শিশুর বোনের স্বামী, তার ছোট ভাই এবং তাদের মা— সবাইকে খালাস দেওয়া হয় নিম্ন আদালতের রায়ে।
দেশের প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, নিম্ন আদালত থেকে মৃত্যুদণ্ডের রায় এলে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সেই নিয়ম মেনেই এই মামলার সব নথিপত্র গত বছরের মে মাসের শেষদিকে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে মামলার পেপারবুক প্রস্তুতের জন্য পাঠানো হয় সরকারি মুদ্রণালয়ে। পেপারবুক তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর তা হাইকোর্টে পাঠানো হয় এ বছরের জুন মাসের শুরুতে, এরপরই মামলাটি শুনানির জন্য নির্দিষ্ট বেঞ্চের কার্যতালিকায় ওঠে।
দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী এই মামলার চূড়ান্ত রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে অনেকেই দেখছেন এই মামলাকে, আর তাই নির্ধারিত রায়ের তারিখ এভাবে বারবার পিছিয়ে যাওয়া নিয়েও সামাজিক মাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া।

