কক্সবাজারের টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদসহ চার আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় পলাতক সাত আসামিকে আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের একক বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে মামলাটির পরবর্তী শুনানির জন্য ৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
কারাগারে পাঠানো অন্য দুই আসামি হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম ও র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক আনোয়ার লতিফ খান। মিফতাহ উদ্দিনসহ চার আসামিই এদিন ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। মাহবুব আলম ও আনোয়ার লতিফ খান অন্য মামলায় আগে থেকেই ঢাকার সেনানিবাসের সাবজেলে রয়েছেন।
সাতজনের বিরুদ্ধে বিজ্ঞপ্তি
মামলায় পলাতক সাত আসামির মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ, মেজর (অব.) রুহুল আমিন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশেকুর রহমান এবং গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব মাহমুদ।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আসামির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তাঁদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় খোঁজ নেওয়া হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁদের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর না হওয়ার প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় তাঁদের আদালতে হাজির করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আবেদন জানানো হয়। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন মঞ্জুর করেন।
কী বলেছে প্রসিকিউশন
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ড. মোহাম্মদ অলি মিয়া। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যরা।
শুনানিতে অলি মিয়া জানান, গত ২৬ জুলাই শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। একই সময়ে তিনজনের বিরুদ্ধে হাজিরা নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশ এবং সাতজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় চারজনকে মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
পরে তাঁদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করে প্রসিকিউশন। একই সঙ্গে পলাতক সাত আসামির আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আবেদন করা হয়।
যে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০১৮ সালের ২৬ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফের কিরণতলীর হোটেল নেটংয়ের সামনে থেকে একরামুল হককে তুলে নেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নোয়াখালিয়া পাড়ায় মেরিন ড্রাইভের সাগরতীরে র্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন।
একরামুল হক ছিলেন টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং উপজেলা যুবলীগের সভাপতি।
মামলায় প্রসিকিউশন অভিযোগ করেছে, একরামুল হককে বেআইনিভাবে আটক ও অপহরণ করা হয়। পরে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে সংশ্লিষ্টতা, প্ররোচনা, সহায়তা এবং হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট অভিযোগও আনা হয়েছে।
মামলার পরবর্তী ধাপ
গত ২৬ জুলাই অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলো। তাঁদের কারাগারে পাঠানোর পাশাপাশি পলাতক সাত আসামিকে আদালতের সামনে হাজির করার প্রক্রিয়াও শুরু হলো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশের মধ্য দিয়ে।
এখন ৭ সেপ্টেম্বরের পরবর্তী শুনানিতে মামলার কার্যক্রম কোন দিকে এগোয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একরামুল হক হত্যার ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল—প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগের বিচারিক মূল্যায়নেও পরবর্তী ধাপগুলোতে সেই প্রশ্নই সামনে আসবে।

