চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে গুলিবিদ্ধ রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজকে আহত অবস্থায় রিকশায় তুলে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন আন্দোলনকারী সাইদ হোসেন। তাঁর ভাষ্য, রিকশায় তোলার সময় ফারহান একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেছিলেন। তাঁর ধারণা, সেটিই হতে পারে ফারহানের মৃত্যুর মুহূর্ত।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে এ ঘটনা বর্ণনা করেন সাইদ হোসেন। মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি প্রসিকিউশনের ছয় নম্বর সাক্ষী।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে সাইদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হঠাৎ গুলি
২৫ বছর বয়সী সাইদ হোসেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
জবানবন্দিতে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের রাপা প্লাজার সামনে জড়ো হন তিনি। আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বার্তা আদান-প্রদানের দলের মাধ্যমে সেখানে জড়ো হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
সাইদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে দেখেন। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও এরপর হঠাৎ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া শুরু হয়।
তখন আত্মরক্ষার জন্য আন্দোলনকারীরা আশপাশের বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নেন। গুলি থামলে আবার সড়কে ফিরে আসেন তাঁরা। পরে আবার গুলি শুরু হলে গলিতে সরে যান। এভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে পরিস্থিতি চলতে থাকে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান সাইদ।
চোখের সামনে পড়ে যান ফারহান
সাইদের ভাষ্য, দুপুর দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে তাঁর সামনেই এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যান। অন্য কয়েকজন আন্দোলনকারীর সঙ্গে তিনি ওই তরুণকে একটি গলিতে নিয়ে যান।
আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে পাঠানোর জন্য কোলে করে একটি রিকশায় তোলা হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর কয়েকজন আন্দোলনকারীর সহায়তায় তাঁকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হয়। এরপর সাইদ আবার আন্দোলনে ফিরে যান।
সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারেন, আহত ওই তরুণের নাম ফারহান ফাইয়াজ। তিনি রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী এবং গুলিতে নিহত হয়েছেন।
সাইদ বলেন, পরে ফারহানের বাবার কাছ থেকে জানতে পারেন, তাঁর বুকের বাঁ পাশে গুলি লেগেছিল। তবে আহত অবস্থায় ফারহানকে রিকশায় তোলার সময় তিনি একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেছিলেন। সাইদের ধারণা, সম্ভবত তখনই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
এই বর্ণনা মূলত একজন প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা। ফারহানের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময় বা কারণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিষয়ক ও অন্যান্য প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ—জবানবন্দিতে সাইদ নিজেও তাঁর ধারণার কথা বলেছেন।
দায়ীদের বিরুদ্ধে বিচারের দাবি
জবানবন্দিতে সাইদ আরও দাবি করেন, পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদপত্রের বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে তিনি জানতে পারেন, তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের নির্দেশনা ও সহায়তায় বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন।
ফারহান ফাইয়াজসহ আন্দোলনে নিহত অন্যদের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচারের দাবি জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন ভিডিওতেও আন্দোলনকারীদের ওপর প্রকাশ্যে গুলি চালানোর দৃশ্য দেখা গেছে।
তিনি আরও জানান, ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ী, মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার তথ্যও পরবর্তী সময়ে তিনি জানতে পারেন।
তবে এসব বক্তব্যের একটি অংশ সাইদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদপত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মামলার বিচারপর্বে এসব দাবির প্রমাণমূল্য নির্ধারণে অন্যান্য সাক্ষ্য ও নথিপত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সাক্ষ্য শেষে জেরা
সাইদ হোসেনের জবানবন্দি শেষে তাঁকে জেরা করেন গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামিদের পক্ষে আইনজীবীরা।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও তারেক আবদুল্লাহ। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সহিদুল ইসলাম সরদার, মামুনুর রশিদসহ অন্যরা।
মামলায় আসামি ২৮ জন
মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় করা এই মামলায় মোট আসামি ২৮ জন। তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন চারজন। তাঁরা হলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক এবং যুবলীগকর্মী ফজলে রাব্বি।
পলাতক আসামিদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রওশুনুল হক, এমএ সাত্তার, তোফায়েল, তারেকুজ্জামান, আরিফুর রহমান তুহিন, আহাদ হোসাইন, মো. ইউনূস, মোল্লা রুবেল, আজিজুল হক, রিয়াজ মাহমুদ, হৃদয়, মাইনুল ইসলাম, শেখ বজলুর রহমান, জহির উদ্দিন, আয়মান, সেন্টু মিয়া এবং ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রন।
ফারহান ফাইয়াজের শেষ মুহূর্তের বর্ণনা তাই মামলার সাক্ষ্যপর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ হিসেবে উঠে এসেছে। তবে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ, গুলির উৎস এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করবে আদালতে উপস্থাপিত সামগ্রিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর।

