বিচার বিভাগের সদস্যদের পেশাগত নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে বাণিজ্যিক কোচিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এখন থেকে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের কোনো সদস্য সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত কোচিং কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবেন না।
শুধু সরাসরি শ্রেণিকক্ষে নয়, ইন্টারনেটভিত্তিক মাধ্যমেও পরিচালিত বাণিজ্যিক কোচিংয়ের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে।
২৫ আগস্ট ২০২৬ ঢাকায় প্রকাশিত এক পরিপত্রে এ নির্দেশনার কথা জানানো হয়। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী এতে স্বাক্ষর করেছেন। প্রধান বিচারপতির অনুমোদনক্রমে জারি করা পরিপত্রটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে।
কেন এই নিষেধাজ্ঞা
পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের সদস্যদের পেশাগত শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের দৃঢ় আস্থা বজায় রাখাই এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য।
বিচারিক দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তা একই সঙ্গে কোনো বাণিজ্যিক শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হলে তাঁর পেশাগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিচারিক দায়িত্বের সুবাদে পাওয়া তথ্য, ব্যক্তিগত পরিচিতি কিংবা পদমর্যাদা যদি অর্থ উপার্জনের কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সেই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই সরাসরি ও ইন্টারনেটভিত্তিক—দুই ধরনের বাণিজ্যিক কোচিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রেই স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
নাম-পরিচয় ব্যবহারেও বাধা
পরিপত্র অনুযায়ী, জুডিসিয়াল সার্ভিসের কোনো সদস্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোচিংয়ের প্রচারে নিজের নাম, পদবি, ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করতে পারবেন না।
শুধু নিজে ব্যবহার করাই নয়, অন্য কেউ যেন তাঁর নাম, পদবি, ছবি বা পরিচয় এ ধরনের প্রচারে ব্যবহার করতে পারে—সেই অনুমতিও দিতে পারবেন না তিনি।
এর ফলে বিচার বিভাগের কোনো সদস্যের পরিচিতি বা পদমর্যাদাকে ব্যবহার করে কোচিং প্রতিষ্ঠানের প্রচার চালানোর পথও বন্ধ হলো।
দাপ্তরিক তথ্য ব্যবহারে কঠোর নিষেধ
বিচারিক দায়িত্ব পালনের সময় কোনো সদস্য যে গোপনীয়, অপ্রকাশিত বা দাপ্তরিক তথ্যের সংস্পর্শে আসেন, তা কোচিং কার্যক্রমে ব্যবহার বা প্রকাশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বিচারিক দায়িত্বের সুবাদে পাওয়া কোনো তথ্য সরাসরি বা ইন্টারনেটভিত্তিক কোচিংয়ে প্রকাশ, সরবরাহ কিংবা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
এ বিধান বিচারিক গোপনীয়তা রক্ষা এবং দায়িত্ব পালনের সঙ্গে ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সীমারেখা স্পষ্ট করার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষাসামগ্রী তৈরিতেও নিষেধ
বাণিজ্যিক কোচিংয়ের জন্য শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুত, সম্পাদনা, প্রকাশ বা সরবরাহ করতেও পারবেন না জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যরা।
অর্থাৎ শুধু কোচিংয়ে শিক্ষকতা বা সরাসরি পাঠদান নয়, পেছন থেকে কোচিংয়ের পাঠ্যসামগ্রী তৈরির কাজেও যুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।
লঙ্ঘন করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
পরিপত্রের নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট জুডিসিয়াল সার্ভিস সদস্যের বিরুদ্ধে প্রচলিত শৃঙ্খলা সংক্রান্ত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ায় বাণিজ্যিক কোচিংয়ের সঙ্গে বিচার বিভাগের সদস্যদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখন থেকে এটি একটি স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখা হিসেবে কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা কেবল আদালতের রায় বা বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না; বিচারকদের পেশাগত আচরণ ও স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর বিষয়টিও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন এই নির্দেশনা সেই নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা রক্ষার কাঠামোকে আরও স্পষ্ট করল।

