বিশেষ বিশ্লেষণ
আইনের বহুল স্বীকৃত নীতি—‘অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ’। আইনের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স’। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি এই নীতি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংবেদনশীল কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে এর ব্যত্যয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতির ক্ষেত্রে এমন প্রবণতার অভিযোগও সামনে এসেছে। যা হলো, কোনো কোনো সংবেদনশীল মামলায় অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবীরা দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করছেন। আবার কেউ আইনগত সহায়তা দিতে আগ্রহী হলে তাকেও সমালোচনা বা সাংগঠনিক চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। অথচ কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত হলেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হন না; অপরাধের সত্যতা ও দায় নির্ধারণের এখতিয়ার আদালতের।
প্রশ্ন হলো— একটি আইনজীবী সমিতি বা তার নেতৃত্ব কি সাংগঠনিকভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখে? এই ধরনের সিদ্ধান্ত আইনজীবীদের এখতিয়ারবহির্ভূত এবং তা পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত নয় কি?
সংবিধানে আইনি প্রতিনিধিত্বের অধিকার
আমাদের সংবিধানে স্পষ্টত আইনি প্রতিনিধিত্বের অধিকারের উপর জোর দেয়া হয়েছে। এই অধিকারকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩ প্রত্যেক গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে নিজ পছন্দের আইনজীবী দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কথা সুনির্দিষ্টভাবে বলে। সাথে অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১ ও ৩৫ আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায্য বিচারের নিশ্চয়তা দেয়।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত একাধিক রায়ে এই অবস্থান স্পষ্ট করেছে যে, বিশেষত মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে আসামির আইনজীবী দ্বারা প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার অধিকারকে একটি “অবিচ্ছেদ্য” ও মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা লঙ্ঘিত হলে বিচার প্রক্রিয়াই বেআইনি হয়ে পড়তে পারে।
আইনজীবীর পেশাগত দায়িত্ববিধি
বাংলাদেশে আইন পেশা নিয়ন্ত্রিত হয় বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মাধ্যমে। বার কাউন্সিলের প্রণীত Canons of Professional Conduct and Etiquette– এ বলা হয়েছে-
“বিচারকের অসন্তুষ্টি বা জনঅসন্তোষের কোনো ভয়ই” আইনজীবীকে তার দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারে না, এবং একজন আইনজীবী কেবল “বিশেষ পরিস্থিতিতে” (স্বার্থের সংঘাত) নির্দিষ্ট মামলা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। এই নীতিটিই মূলত আইনজীবীদের বর্জনের বিরুদ্ধে সরাসরি পেশাগত যুক্তি। একজন আইনজীবীর দায়িত্ব জনরোষ বা সামাজিক চাপ থেকে স্বাধীন থাকা, এমনকি যদি মক্কেল অত্যন্ত অজনপ্রিয় বা ঘৃণিত ব্যক্তি হন।
বরগুনায় মিন্নির পক্ষে আইনজীবী না পাওয়া, লালমনিরহাটে মাদক মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে এক মাসের সমষ্টিগত বর্জন ঘোষণা— এসব ঘটনায় ব্যক্তির আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাস্তবে ব্যাহত হয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ. এস. মোহাম্মদ রফি বনাম তামিলনাড়ু রাজ্য (২০১০) (2011) 1 SCC 688– মামলায় অনুরূপ বার অ্যাসোসিয়েশন-প্রস্তাবকে “সম্পূর্ণ বেআইনি ও পেশাগত নীতিশাস্ত্রের বিরুদ্ধে” ঘোষণা করে শূন্য ও বাতিল বলেছে।
জাতিসংঘের মৌলিক নীতিমালা
জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে হাভানা কংগ্রেসে আইনজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কিত মৌলিক নীতিমালা (Basic Principles on the Role of Lawyers) গ্রহণ করে, যা যদিও একটি “সফট ল” যা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবু বিশ্বব্যাপী বিচার বিভাগ ও আইন পেশার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই আইনের নীতি ১৪ ও ১৫ অনুযায়ী আইনজীবী মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার রক্ষা করে মক্কেলের স্বার্থের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন। নীতি ১৮ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির আইনজীবী হওয়া মানেই তার কাজ বা মতাদর্শকে সমর্থন করা নয়। নীতি ১৯ মক্কেলের পক্ষে আইনজীবীর আদালতে উপস্থিতির অধিকার নিশ্চিত করে এবং নীতি ২১ অনুযায়ী আইনজীবীর দায়িত্ব হলো মক্কেলকে তার আইনি অধিকার সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া, যথাযথ আইনি সহায়তা করা এবং প্রয়োজনে আদালতে প্রতিনিধিত্ব করা।
একইসঙ্গে বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)-এর অনুচ্ছেদ ১১(১) এবং ICCPR-এর অনুচ্ছেদ ১৪(৩)(ঘ)-তে প্রত্যেক অভিযুক্তের নিজ পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের এবং প্রয়োজনে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। এসব নীতিমালার মূল বার্তা একটাই, আইনি প্রতিনিধিত্ব কোনো পুরস্কার নয় যা ব্যক্তির চরিত্র বা জনপ্রিয়তার নিরিখে বিতরণ করা হয়, বরং এটি একটি ন্যায্য বিচারের পূর্বশর্ত।
বিভিন্ন দেশে কী বলা হয়েছে
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টারদের জন্য প্রযোজ্য এই বিখ্যাত নীতিটি লন্ডনের ট্যাক্সিক্যাব চালকদের রীতি থেকে নামকরণ করা হয়েছে। যেভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্যাব চালক লাইনে দাঁড়ানো পরবর্তী যাত্রীকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না, তেমনি একজন ব্যারিস্টার তার দক্ষতার আওতাভুক্ত যেকোনো মামলা, মক্কেলের পরিচয়, মামলার প্রকৃতি বা মক্কেলের চরিত্র, খ্যাতি, উদ্দেশ্য বা দোষ-নির্দোষ সম্পর্কে ব্যক্তিগত মতামত নির্বিশেষে গ্রহণ করতে বাধ্য, যদি তিনি যথাযথ পারিশ্রমিক পান। এই নীতির ঐতিহাসিক উৎস খুঁজে পাওয়া যায় আঠারো শতকের আইনজীবী টমাস আর্স্কিনের মধ্যে, যিনি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলে বিপ্লবী চিন্তাবিদ টমাস পেইনের রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় প্রতিরক্ষা আইনজীবী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন।
ভারত আদালতের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট রায়
আগেও বলা হয়েছে যে, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এ. এস. মোহাম্মদ রফি বনাম তামিলনাড়ু রাজ্য (২০১০) মামলায় স্পষ্ট রায় দেয় যে, কোনো বার অ্যাসোসিয়েশনের এমন প্রস্তাব যে তার সদস্যরা কোনো নির্দিষ্ট অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়াবেন না— তা “সম্পূর্ণ বেআইনি, বারের সব ঐতিহ্যের পরিপন্থী এবং পেশাগত নীতিশাস্ত্রের বিরুদ্ধে।” আদালত ঘোষণা করে যে “ভারতে বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর এ ধরনের সকল প্রস্তাব শূন্য ও বাতিল ঘোষনা করে কারন এ ধরনের প্রস্তাব প্রকৃতপক্ষে আইন সম্প্রদায়ের জন্য লজ্জাজনক।”
এই নীতি পরবর্তীতে রূপশ্রী এইচ. আর. বনাম কর্ণাটক রাজ্য মামলাসহ একাধিক মামলায় পুনর্ব্যক্ত হয়েছে, এবং ২০১২ সালের নির্ভয়া (দিল্লি গণধর্ষণ) মামলা, ২০১৭ সালের গুরগাঁও প্রদ্যুম্ন ঠাকুর হত্যা মামলা, ২০১৯ সালের হায়দ্রাবাদ ধর্ষণ মামলা এবং ২০২৪ সালের বদলাপুর মামলাসহ একাধিক ঘটনায় বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর অনুরূপ বর্জন-প্রস্তাব সামনে এসেছে ও সমালোচিত হয়েছে। ২০২৫ সালে মাদ্রাজ হাইকোর্ট ভারতের বার কাউন্সিল বিধিমালার নিয়ম ১১ রেফার করে, আরও একধাপ এগিয়ে রায় দেয় যে, বার অ্যাসোসিয়েশনের সামষ্টিক বর্জন কার্যকর করা “আইনের শাসনের প্রতি অবমাননাকর” এবং ভারতীয় সংবিধানের ২১, ২২ ও ৩৯ক অনুচ্ছেদ থেকে অবিচ্ছেদ্য অধিকার লঙ্ঘন করে।
আইনজীবীদের যুক্তি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা
ন্যায্যতার স্বার্থে এই বিতর্কের অন্য দিকটিও তুলে ধরা প্রয়োজন। যারা এ ধরনের ঘোষণার পক্ষে যুক্তি দেন, তারা সাধারণত নিম্নলিখিত কারন তুলে ধরেন—
একজন আইনজীবীরও বিবেক ও রাজনৈতিক-সামাজিক মতামত থাকতে পারে, এবং তাকে জোর করে কোনো মামলা নিতে বাধ্য করা তার নিজের পেশাগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ বলে কেউ কেউ মনে করেন।
অত্যন্ত স্পর্শকাতর মামলায় (যেমন গণধর্ষণ বা গণপিটুনির শিকার অপরাধী) আইনজীবীরা নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে পারেন। তবে নিরাপত্তা-উদ্বেগের সমাধান আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করায়, প্রতিনিধিত্ব অস্বীকারে নয়, এটি সমস্যার প্রকৃত কারণ সমাধান না করে ভুক্তভোগীর অধিকার খর্ব করে।
কিছু ক্ষেত্রে আমরা আইনজীবী সমিতির সমষ্টিগত “প্রতীকী প্রতিবাদ” দেখতে পায়। কিন্ত এই যুক্তিতে যদি প্রতিটি সমিতি নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ডে কাউকে “অযোগ্য” ঘোষণা করে প্রতিনিধিত্ব অস্বীকার করার অধিকার পায়, তাহলে বিচারব্যবস্থা জনরোষ-নির্ভর হয়ে পড়বে, যা প্রমাণ ও আইনের শাসনের বদলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে বিচার পরিচালনার পথ খুলে দেয়, যা ন্যায্য বিচারের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
এই মামলা নেয়া না নেয়া বিতর্কের মধ্যে আইনজীবীদের সামনে এক মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়, তারা কি ন্যায়বিচার-ব্যবস্থার একজন সেবক, নাকি নিজের ব্যক্তিগত নৈতিক রায়ের একজন ঘোষক? যদি আজ কারো প্রতিনিধিত্ব করা থেকে বিরত থাকেন কারণ সমাজ তাকে ঘৃণা করে, তাহলে কাল যখন সমাজ ভুল করে কাউকে ঘৃণা করবে, আর সেই নিরপরাধ মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকবে না।
- জয়দীপ ঘোষঃ লিগ্যাল রিসার্চার

